ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৭ এপ্রিল- ঐতিহাসিক ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস এবার সরকারিভাবে পালিত হচ্ছে না। প্রতিবছর রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করা হলেও চলতি বছরে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। বিষয়টি ঘিরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
১৯৭১ সালের এই দিনে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করে। সেই সময় বৈদ্যনাথ তলাকে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করে এটিকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। এই শপথগ্রহণের মধ্য দিয়েই বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দিনটি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর মুজিবনগরের ইপিআর ক্যাম্পের দায়িত্ব নেন ১২ জন আনসার সদস্য। তারা ভারত থেকে আসা যুদ্ধের রসদ সংগ্রহ করে তৎকালীন এসডিও তৌফিক-ই-এলাহীর কাছে হস্তান্তর করতেন, যা পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হতো।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত হয় অস্থায়ী সরকার, যা প্রবাসী সরকার নামেও পরিচিত। নিরাপদ স্থানের সন্ধানে এই সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের জন্য মুজিবনগরকে বেছে নেওয়া হয়। ১৬ এপ্রিল স্থানীয় সংগ্রাম কমিটি ও গ্রামবাসীদের সহায়তায় বর্তমান মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়। ওই রাতেই ভারতীয় সেনারা পুরো এলাকা ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
পরদিন ১৭ এপ্রিল সকালে জাতীয় চার নেতা সেখানে উপস্থিত হন। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং ১২ জন আনসার সদস্য গার্ড অব অনার প্রদান করেন। শপথবাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী এবং গার্ড অব অনারের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন পুলিশ সুপার মাহবুবউদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠান শেষে নেতৃবৃন্দ ভারতে চলে যান এবং সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হয়।
সেদিনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী বাকের আলী বলেন, ১৯৭১ সালের ইতিহাস ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। তিনি মনে করেন, মুজিবনগর দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন না করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তাই দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি সরকারের উচিত এই দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও লেখক রফিকুর রশীদ রিজভী বলেন, ১৭ এপ্রিল গঠিত সরকারই ছিল বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক সরকার। এই সরকারের শপথ গ্রহণ না হলে আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারত। তিনি বলেন, এই সরকারের নেতৃত্বেই পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং ১১টি সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালিত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণও এই সরকারের অধীনেই সম্পন্ন হয়। তার মতে, মুজিবনগর সরকারকে অস্বীকার করা মানে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অস্বীকার করা।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে কোনো ধরনের প্রস্তুতি না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা যথাযোগ্য মর্যাদায় মুজিবনগর দিবস পালনের দাবি জানিয়েছেন।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় জানান, এখন পর্যন্ত সরকার থেকে মুজিবনগর দিবস পালনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা পেলে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। তবে নির্দেশনা না এলে এ বছর দিবসটি সরকারিভাবে পালিত হবে না।