খর্বশক্তির নিউজিল্যান্ডের কাছেই হেরে গেল বাংলাদেশ
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে অপ্রত্যাশিত হারে শুরু করেছে বাংলাদেশ। শীর্ষ বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার ছাড়া দল…
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- আমেরিকার উচ্চপর্যায়ের পারমাণবিক ও মহাকাশ গবেষণা কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কর্মরত ছিলেন- এমন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিজ্ঞানীর রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে দেশটির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গত তিন বছরে অন্তত ১০ জন মার্কিন বিজ্ঞানী নিখোঁজ হয়েছেন অথবা অস্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন।
অতি গোপনীয় এসব গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত এই বিজ্ঞানীদের ভাগ্যে ঠিক কি ঘটেছে? সেই প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে পাচ্ছে না এফবিআই, সিআইএ-সহ দেশটির প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বিশেষ করে আমেরিকার পারমাণবিক গবেষণার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি। বর্তমানে যেখানে নতুন ধরনের স্বল্প শক্তির পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে গবেষণা চলছে। যা এই ঘটনাগুলোকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
কী বলছে হোয়াইট হাউস
এ নিয়ে দীর্ঘ নীরবতায় যখন প্রশাসনের ওপর নানামুখী চাপ বাড়ছে, তখন মুখ খুলেছে হোয়াইট হাউস। নিখোঁজ হওয়া বিজ্ঞানীদের নিয়ে গত বুধবার একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলিনি। তবে অবশ্যই কথা বলব।’
“যদি এই ঘটনা সত্যি হয়, সরকার অবশ্যই বিষয়টি খতিয়ে দেখার যোগ্য বলে মনে করবে। তাই আমাকে সেটি করতে দিন।”
তিনি আরও বলেন, ‘এসব ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না- তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনা করা হবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও বিস্তারিত তথ্য পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।’
সমালোচনার মুখে ট্রাম্প প্রশাসন
নিখোঁজ বিজ্ঞানীদের নিয়ে হোয়াইট হাউসের এমন প্রতিক্রিয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে না। বরং ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হওয়া বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল উইলিয়াম নীল ম্যাকক্যাসল্যান্ডের কথা উল্লেখ করে একজন সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, “এর অর্থ কি তারা এখনো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে না? অথচ তিনি একজন জেনারেল!”
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩ সাল থেকে পারমাণবিক অস্ত্র গবেষণাগার, উন্নত মহাকাশ ও ফিউশন গবেষণা কেন্দ্রের মতো উচ্চপর্যায়ের বৈজ্ঞানিক কাজের সঙ্গে যুক্ত কমপক্ষে ১০ জন ব্যক্তি হয় নিখোঁজ হয়েছেন অথবা সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে প্রাণ হারিয়েছেন।
আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি
বিজ্ঞানী নিখোঁজের এসব ঘটনাগুলো আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে। সেসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, নাসা জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি এবং এমআইটি প্লাজমা সায়েন্স অ্যান্ড ফিউশন সেন্টার।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন, উন্নত প্রপালশন সিস্টেম এবং পরবর্তী প্রজন্মের জ্বালানি প্রযুক্তির ওপর আলোকপাত করে। উচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টিত এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে এতগুলো ঘটনাকে সম্ভাব্য গুপ্তচরবৃত্তি, নিরাপত্তা লঙ্ঘন বা অন্য কোনো হুমকির বিষয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনাগুলো একই প্যাটার্নে
প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ওই বিজ্ঞানীদের নিখোঁজ হওয়ার ধরন বা প্যাটার্ন হুবহু মিলে গেছে। যেমন: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা তাদের মোবাইল ফোন, ওয়ালেট ও চাবির মতো জরুরি জিনিসগুলো বাড়িতে রেখে পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেছেন। নিখোঁজ হওয়ার পাশাপাশি কেউ কেউ সহিংস পরিস্থিতিতে মারা গেছেন।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। ছবি সংগৃহীত
গুপ্তচরবৃত্তি বা সুপরিকল্পিত অপহরণ
বিজ্ঞানীদের নিখোঁজ হওয়ার ধরন বা প্যাটার্ন দেখে বিশেষজ্ঞরা ধারনা করছেন, তাদের কেউ পরিকল্পিত অপহরণ অথবা গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। এ নিয়ে সতর্ক করে তারা বলছেন, নিখোঁজ বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গোপনীয় বা স্পর্শকাতর তথ্য রয়েছে। এ কারণেই তারা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
এরই মধ্যে তদন্তকারীরা নিখোঁজ বিজ্ঞানীদের ফেলে যাওয়া ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছেন। এসবের পেছনে গুপ্তচরবৃত্তি বা সুপরিকল্পিত অপহরণের সম্ভাবনা দেখছেন তারা।
এফবিআই- এর সাবেক একজন কর্মকর্তা ক্রিস সোয়েকার সেই রকম ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, এই ক্ষেত্রে গুপ্তচরবৃত্তি বা সুপরিকল্পিত অপহরণের বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নিখোঁজ যারা
জেনারেল উইলিয়াম নীল ম্যাকক্যাসল্যান্ড
মার্কিন বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এই জেনারেল লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি একজন মহাকাশ প্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা নজরদারি সংক্রান্ত গবেষণায় বিশেষজ্ঞ। চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্ক থেকে জেনারেল নীল ম্যাকক্যাসল্যান্ড নিখোঁজ হন। ঘটনার আগে তিনি তার মোবাইলফোন, চশমা এবং চাবি বাড়িতে রেখে যান।
তদন্তকারীরা জেনারেল নীল ম্যাকক্যাসল্যান্ডের বাড়িতে রক্তের কোনো চিহ্ন পাননি। তবে তার ব্যক্তিগত রিভলভার খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা। সিসিটিভি ফুটেজে শেষবার তাকে তার বাড়ির কাছে হাঁটতে দেখা যায়।
কার্ল গ্রিলমেয়ার
তিনি একজন প্রখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিদ। কাজ করতেন নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরিতে। মহাকাশ যানের আধুনিকায়নে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। এই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার আলটাদেনায় নিজ বাড়িতে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার শরীরের একাধিক গুলির চিহ্ন ছিল।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে জেমস পোর্টার নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে হত্যার পেছনের উদ্দেশ্য এখনো অস্পষ্ট ও রহস্যজনক।
মনিকা রেজা
উন্নত সেন্সর এবং মহাকাশ যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ করতেন মনিকা রেজা। তিনিও নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরিতে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের জুন মানে তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান।
তার ক্ষেত্রেও গোয়েন্দারা দেখতে পান, তিনি বাড়ি থেকে হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এরপর আর ফিরে আসেননি। মনিকা রেজা তার মোবাইল এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিস বাড়িতেই রেখে যান।
মেলিসা ক্যাসিয়াস
লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা মেলিসা ক্যাসিয়াস। ল্যাবরেটরির প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে কাজ করতে তিনি। তার কাছে এই ল্যাবরেটরির উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছিল। তিনিও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিখোঁজ হয়ে যান।
নিখোঁজ হওয়ার পর মেলিসা ক্যাসিয়াসের ফোনটি খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সেটি ‘ফ্যাক্টরি রিসেট’ বা সব তথ্য মুছে ফেলা অবস্থায় ছিল। যা তদন্তকারীরা নাশকতা হিসেবে ধারণা করছে।
থমাস ক্রোলিক
লস আলামস ল্যাবরেটরির একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন থমাস ক্রোলিক। ছিলেন গোপন প্রজেক্টের কাজে নিয়োজিত। রহস্যজনক অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অ্যান্থনি শ্যাভেজ
৭৯ বছর বয়সী এই ব্যক্তি ২০১৭ সাল পর্যন্ত লস আলামস ল্যাবরেটরিতে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের মে মাসে অ্যান্থনি শ্যাভেজ তার নিউ মেক্সিকোর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি তার ফোন, ওয়ালেট ইত্যাদি ফেলে পায়ে হেঁটে বের বাড়ি থেকে হয়ে যান।
আন্দ্রে ক্যাশ ও ফিলিপ রিভল
আমেরিকার উচ্চ নিরাপত্তা সম্পন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিলেন আন্দ্রে ক্যাশ এবং ফিলিপ রিভল। তারা দু’জনই প্রায় একই প্রক্রিয়ায় নিজেদের ফোন, ওয়ালেট, চাবি ইত্যাদি নিজেদের বাড়িতে রেখে পায়ে হেঁটে যাওয়া বের হয়ে যান। তারপর থেকে তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজ মার্কিন পরমাণু বিজ্ঞানী। ছবি: সংগৃহীত
বেশিরভাগই মেক্সিকো, ক্যালিফোর্নিয়ার
নিখোঁজ বিজ্ঞানীদের বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে গোয়েন্দারা দেখতে পান, তাদের বেশিরভাগই নিউ মেক্সিকো এবং ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলের। এছাড়া তাদের সবার কাজের ক্ষেত্র ছিল পারমাণবিক অস্ত্র এবং মহাকাশ প্রতিরক্ষা- যা সরাসরি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত।
টার্গেট মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্রের নকশা?
আমেরিকার নিউক্লিয়ার গবেষণার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি। এখানেই দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের নকশা এবং অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় এখানে কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তকারীরা একটা বিষয়ে মিল পেয়ে চমকে উঠেছেন। তারা লক্ষ্য করেছেন, নিখোঁজ বিজ্ঞানীরা লস আলামস বা নাসার এমন সব প্রজেক্টে কাজ করতেন যা মহাকাশ প্রযুক্তি, উন্নত প্রপালশন এবং ফিউশন শক্তির সাথে যুক্ত। তারা মনে করেন, এইসব গবেষণাগার থেকে তথ্য হাতিয়ে নেওয়াই মূল লক্ষ্য হতে পারে।
কঠোর নিরাপত্তা নির্দেশিকা
এরই মধ্যে ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনএনএনএ)- এর প্রধান ব্র্যান্ডন এম. উইলিয়ামস সম্প্রতি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা করেছেন। তিনি ল্যাবরেটরির কর্মীদের জন্য আরও কঠোর নিরাপত্তা নির্দেশিকা জারি করেছেন।
এছাড়াও সাম্প্রতিক নিখোঁজের ঘটনাগুলোর পর ল্যাবরেটরিতে কর্মীদের ব্যক্তিগত ডিভাইসের ব্যবহার এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকারের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে ।
হোয়াইট হাউস এবং এফবিআই খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছে, ল্যাবরেটরির ভেতর থেকে কোনো নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মাধ্যমে এই বিজ্ঞানীদের তথ্য বাইরে পাচার হয়েছে কি না?
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au