যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ২য় দফায় আলোচনার সোমবার
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা আগামী সোমবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে।…
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- দেশের স্বাস্থ্য খাতে রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা এবং একাধিক অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অন্তত ১১টি রোগের টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি ১৫টি রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংক্রামক ও অসংক্রামক মিলিয়ে অন্তত ২৬টি রোগ আবার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি শুধু সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে স্থবিরতা
১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় দেশে ব্যাপক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অপারেশন প্ল্যানগুলোর অধীনে টিকাদান, অবকাঠামো উন্নয়ন, ওষুধ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য সেবা পরিচালিত হতো।
মোট ৩৮টি কর্মসূচির মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে সচল রাখা হতো, যা পাঁচ বছর পরপর নবায়ন করা হতো। কিন্তু চতুর্থ এইচপিএনএসপি শেষ হওয়ার পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া পঞ্চম কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগেই ২০২৫ সালের মার্চে হঠাৎ অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পর স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়।
টিকা কেনায় জটিলতা, সরবরাহে ঘাটতি
ওপি বন্ধ হওয়ার ফলে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আগে ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় টিকা কেনা হতো, যা দ্রুত ও কার্যকর ছিল। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্তে ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে টিকা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জটিলতার কারণে প্রক্রিয়া আটকে যায়।
পরে আবার ইউনিসেফকে যুক্ত করা হলেও এই পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস সময় নষ্ট হয়। এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকা সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দেয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, এ সময় অনেক শিশু নির্ধারিত ডোজের টিকা পায়নি, ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে।
১১ রোগ প্রতিরোধে টিকার ঘাটতি
ইপিআই কর্মসূচির আওতায় শিশুদের জন্য বিসিজি, পেন্টা, পোলিও, পিসিভি, এমআর, টাইফয়েড, রোটাভাইরাসসহ মোট সাত ধরনের টিকা দেওয়া হয়, যা ১১টি রোগ প্রতিরোধ করে।
এগুলো হলো যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস বি, পোলিও, নিউমোনিয়া, হাম, রুবেলা, টাইফয়েড ও ডায়রিয়াজনিত রোগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এসব রোগ আবার ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেশে বাড়ছে হাম পরিস্থিতি, ছবিঃ সংগৃহীত
২৬ রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি বন্ধ
অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাম, রুবেলা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কালাজ্বর, ফাইলেরিয়া, হেপাটাইটিস, টাইফয়েড, পোলিও, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কৃমি, রাতকানা, অটিজম, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্যসহ অন্তত ২৬টি রোগের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
ফলে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভিটামিন এ, কৃমি নিয়ন্ত্রণসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বন্ধ
২০২৫ সালের মার্চে সর্বশেষ ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের পর এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কর্মসূচি শিশুদের অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল।
একইভাবে প্রায় ২৭ বছর ধরে চলা কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও বন্ধ রয়েছে। এতে শিশুদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণ ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও কালাজ্বরের ঝুঁকি
অর্থ সংকট ও কর্মসূচি বন্ধ থাকায় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ডেঙ্গু জরিপ ও মশারি বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অন্যদিকে কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও বন্ধ থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে রোগটি ফের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যক্ষ্মা ও এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে সংকট
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বড় অংশ বন্ধ থাকায় ওষুধ ও টিকা সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর অর্থায়নও বন্ধ হয়ে গেছে।
এইচআইভি শনাক্তকরণ কর্মসূচিতেও কিট সংকট দেখা দিয়েছে, ফলে রোগ শনাক্তে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের কর্মসূচিগুলো পরিচালনায় নিয়োজিত প্রায় ৪৫ হাজারের বেশি জনবল ছিল। তবে অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ২৫ হাজার কর্মীর বেতন বন্ধ হয়ে যায় এবং অনেকেই অনিশ্চয়তায় পড়েন।
এ অবস্থায় নতুন করে নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, কোনো বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়াই অপারেশন প্ল্যান বন্ধ করায় দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল বলেন, দ্রুত সমন্বিত নীতিমালা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সাবেক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘদিনের দাতা নির্ভর ব্যবস্থার কারণে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করেছে।
বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, টিকাদান ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পুনরায় চালুর জন্য দ্রুত ডিপিপি ও নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে টিকা ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে বলে তিনি জানান।
সূত্রঃ সমকাল
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au