যুক্তরাষ্ট্রে নিজের ৭ সন্তানসহ ৮ শিশুকে গুলি করে হত্যা করলেন বাবা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের শ্রিভপোর্ট শহরে এক বন্দুকধারীর গুলিতে আট শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সাতজনই ছিল হামলাকারীর নিজের সন্তান। পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর এটি দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার ঘটনার একটি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রোববার ভোরে শহরের তিনটি আলাদা বাড়িতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুদের বয়স ছিল ১ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। শুরুতে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাদের বয়স ১ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে।
শ্রিভপোর্ট পুলিশের করপোরাল ক্রিস বোর্ডেলন জানান, হামলাকারীর নাম শামার এলকিন্স এবং ঘটনাটি পারিবারিক সহিংসতার অংশ। হামলার সময় এক ১৩ বছর বয়সী কিশোর প্রাণ বাঁচাতে বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে আহত হয়। তার শরীরে কয়েকটি হাড় ভেঙেছে, তবে সে সুস্থ হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয় এক সংবাদ সম্মেলনে রাজ্যের প্রতিনিধি ট্যামি ফেলপস জানান, গুলির সময় কয়েকজন শিশু বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
পুলিশ জানায়, হামলায় আরও দুই নারী গুলিবিদ্ধ হন। প্রথমে এলকিন্স তার স্ত্রীকে গুলি করেন। গুলিবিদ্ধ ওই নিহত ৭ শিশুর মা গুরুতর আহত অবস্থায় রয়েছেন। এরপর তিনি অন্য একটি বাড়িতে গিয়ে এক শিশুসহ আরও এক নারীকে গুলি করে। নিহত অষ্টম শিশুর ওই মায়ের জীবনও সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে অস্ত্র সংক্রান্ত একটি মামলায় এলকিন্স গ্রেপ্তার হয়েছিল। এছাড়া তিনি লুইজিয়ানা আর্মি ন্যাশনাল গার্ডে সাত বছর কর্মরত ছিলেন এবং ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন, যদিও তাকে কোনো যুদ্ধে পাঠানো হয়নি।
হামলার পর একটি গাড়ি ছিনতাই করে পালানোর সময় পুলিশ ধাওয়া করে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করছে লুইজিয়ানা স্টেট পুলিশ।
শ্রিভপোর্টের মেয়র টম আর্সেনো বলেন, “এই ঘটনা পুরো শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছে, এটি আমাদের সবার ওপর প্রভাব ফেলেছে।”
গান ভায়োলেন্স আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত অন্তত ১১৪টি গণগুলি ঘটেছে। যেখানে হামলাকারী ছাড়া চার বা তার বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়, সেগুলোকে গণগুলি হিসেবে ধরা হয়।
প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার জনসংখ্যার এই শহরে হত্যাকাণ্ডের ৩০ শতাংশের বেশি ঘটনাই পারিবারিক সহিংসতার সঙ্গে জড়িত বলে জানান সিটি কাউন্সিল সদস্য গ্রেসন বুশার।
পুলিশ জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ৬টার কিছু পরে সিডার গ্রোভ এলাকায় গুলির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা ওয়েস্ট ৭৯তম স্ট্রিটের দুটি বাড়ি এবং হ্যারিসন স্ট্রিটের আরেকটি বাড়িতে নিহতদের খুঁজে পায়। ঘটনাস্থলকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন কর্মকর্তারা।
এক প্রতিবেশীর নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলাকারী একটি টায়ারের দোকানের দিকে দৌড়ে পালাচ্ছে। পাশের বাড়ির বাসিন্দা লিজা ডেমিং জানান, কয়েকদিন আগেও তিনি ওই ব্যক্তিকে শিশুদের সঙ্গে দেখেছেন। পরে বাইরে এসে তিনি একটি বাড়ির ছাদে ঢাকা দেওয়া অবস্থায় একটি শিশুর মরদেহ দেখতে পান।
পুলিশ এখনো নিহতদের নাম প্রকাশ করেনি।
ঘটনার পর সিটি কাউন্সিল সদস্য টাবাথা টেলর আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, এই কঠিন সময়ে পরিবার ও কমিউনিটির পাশে দাঁড়াতে সবার এগিয়ে আসা জরুরি। তিনি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সহায়তার আহ্বান জানান।
শ্রিভপোর্ট পুলিশের প্রধান ওয়েন স্মিথ বলেন, “এ ধরনের ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন এই হত্যাকাণ্ডকে হৃদয়বিদারক বলে মন্তব্য করেছেন এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
এদিকে স্থানীয় শিক্ষা বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট কিথ বার্টন বলেন, এই কঠিন সময়ে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, পরিবারগুলোকে সহায়তা করা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে মানসিকভাবে সহায়তা দেওয়া জরুরি।
মেয়র আর্সেনো বলেন, “এ ধরনের ঘটনা আমাদের হৃদয়, চিন্তা এবং নিরাপত্তাবোধে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।”
সূত্রঃ সিএনএন