যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। দলের ভেতরের চাপ, উচ্চপর্যায়ের গোপন বৈঠক এবং আসন্ন পার্লামেন্টারি জটিল পরিস্থিতি মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্ব কতদিন টিকবে, তা নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে লন্ডনের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পরিস্থিতি এতটাই সংবেদনশীল যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আগামী শুক্রবারের আগেই বড় সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সূত্রের দাবি, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম একটি গোপন বৈঠকে মিলিত হন। অ্যাশটন-আন্ডার-লাইনে রেনারের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে প্রথমে ঘনিষ্ঠরা সাধারণ আলোচনা বলে উড়িয়ে দিলেও, লেবার পার্টির ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, সেখানে দলীয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং আসন্ন নির্বাচনী বিপর্যয় নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, ওই বৈঠকে আগামী ৭ মের স্থানীয় নির্বাচনের একটি অভ্যন্তরীণ জরিপ নিয়েও আলোচনা হয়, যেখানে লেবার পার্টির বড় ধরনের আসন ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ওই জরিপে দুই হাজারের বেশি কাউন্সিলর পদ হারানোর সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, যা সরাসরি স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইঙ্গিত হলো অ্যাঞ্জেলা রেনারের অবস্থান। দলের এক জ্যেষ্ঠ এমপির দাবি, তার বিরুদ্ধে চলমান কর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সরাসরি নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামতে পারছেন না। তবে এর মধ্যেই নেতৃত্ব কাঠামো পুনর্বিন্যাসের আলোচনা শুরু হয়েছে। আলোচনায় রেনারের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং বার্নহ্যামের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাঠামো নিয়ে শর্তও উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার পার্লামেন্টে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী স্টারমার। লর্ড ম্যান্ডেলসনকে কেন্দ্র করে একটি বিতর্কিত নিয়োগ ইস্যু নিয়ে তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে হাউস অব কমন্সে। অভিযোগ উঠেছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে ওই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে সরকারিভাবে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ছবিঃ রয়টার্স
রাজনৈতিক মহলে ধারণা, স্টারমার এ বিষয়ে নিজেকে অজ্ঞ বলে দাবি করতে পারেন। তবে লেবার পার্টির ভেতরে অনেক ব্যাকবেঞ্চার এমপি ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন পাল্টা অবস্থান নেওয়ার জন্য। যদি প্রধানমন্ত্রী সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে দলটির বামপন্থি অংশ সরাসরি পদত্যাগের দাবি তুলতে পারে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, সোমবার সন্ধ্যার মধ্যেই এই দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠতে পারে।
একই সময়ে মঙ্গলবার পার্লামেন্টারি কমিটিতে সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন বরখাস্ত হওয়া ফরেন অফিস প্রধান স্যার অলি রবিন্স। তার বক্তব্য স্টারমারের অবস্থানের বিপরীতে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রবিন্সের দাবি যদি সত্য হয় যে রাজনৈতিক চাপেই বিতর্কিত নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই ঘটনা মিলিয়ে সোমবারই একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। এমনকি স্টারমার পদত্যাগ না করলেও, তার নেতৃত্বের ওপর চাপ এতটাই বাড়বে যে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেই উপ-প্রধানমন্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পান না। তবে দলীয় কাঠামো এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ থাকে। সে ক্ষেত্রে অ্যাঞ্জেলা রেনারকে অন্তর্বর্তী বা স্থায়ী নেতা হিসেবে সামনে আনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
অন্যদিকে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নামও আলোচনায় রয়েছে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে। তবে তার রাজনৈতিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য সংসদীয় ফেরার কৌশল নিয়ে এখনও স্পষ্টতা নেই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক দিন স্টারমারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোমবার তিনি টিকে থাকলেও, ৭ মের স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। বড় ধরনের পরাজয় হলে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবও আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লেবার পার্টির ভেতরের একাংশ মনে করছে, স্টারমার এখনও পদত্যাগের চেয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নেবেন। তবে পরিস্থিতির চাপ যদি বাড়তে থাকে, তাহলে নেতৃত্ব পরিবর্তন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই মুহূর্তে ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, কিয়ার স্টারমার কি সত্যিই আগামী শুক্রবার পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবেন?