ভেস্তে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনা। প্রতিকী ছবি
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- ওমান উপসাগরে ইরানের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ জব্দকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনাকে ভেস্তে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র দুই দিন বাকি থাকলেও এই সময়ের মধ্যে তা টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে সৃষ্ট এই উত্তেজনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ‘তুস্কা’ নামের একটি ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ জব্দ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি নৌ অবরোধ ভেঙে যাওয়ার চেষ্টা করছিল এবং বারবার সতর্কতা উপেক্ষা করায় সেটির ইঞ্জিনরুমে গুলি চালিয়ে অচল করে দেওয়া হয়। এরপর মার্কিন মেরিন সদস্যরা জাহাজটিতে উঠে সেটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এই ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রীয় কমান্ড(সেন্টকম), যেখানে দেখা যায় মার্কিন হেলিকপ্টার জাহাজটির ওপর চক্কর দিচ্ছে এবং দড়ি বেয়ে মেরিন সদস্যরা জাহাজে অবতরণ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে সতর্ক করার পরও জাহাজটি থামেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ইরানি পতাকাবাহী জাহাজটির নাম ‘তুস্কা’। জাহাজটি ইরানের বন্দর আব্বাসের দিকে যাচ্ছিল। ছবি: যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের ভিডিও
অন্যদিকে ইরান এই ঘটনাকে ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’ এবং ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং এর ‘উপযুক্ত জবাব’ দেওয়া হবে। ইরানের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কোনো অবস্থাতেই ছেড়ে দেবে না তেহরান। তার ভাষায়, এটি ইরানের ‘মৌলিক অধিকার’ এবং কোন জাহাজ চলাচল করবে, সেটিও তারা নির্ধারণ করবে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই যুদ্ধবিরতি বজায় রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স-এর। তবে এই আলোচনায় ইরান অংশ নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করলে তারা আলোচনায় বসবে না। ফলে সাম্প্রতিক এই জাহাজ জব্দের ঘটনায় আলোচনায় ইরানের অংশগ্রহণ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশায়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১১ই এপ্রিল ২০২৬। ছবিঃ রয়টার্স
এরই মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে মধ্যস্থতার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখার আশ্বাস দেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে আলোচনার টেবিলে বসা নিয়েই এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নৌ অবরোধ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এই তিনটি ইস্যুই এখন সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগেই তা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা ও রয়টার্স