কঠোর নিরাপত্তা বিধিতে শ্রেণিকক্ষে ফিরল ইউএইর শিক্ষার্থীরা
মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে কয়েক সপ্তাহ দূরশিক্ষণের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে লাখো শিক্ষার্থী। সোমবার, ২০ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে স্কুল,…
মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক একাধিক জনমত জরিপে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একসময় দ্রুত উত্থানের মাধ্যমে আলোচনায় উঠে আসা ডানপন্থী দল ‘ওয়ান নেশন’-এর অগ্রযাত্রা এখন কিছুটা থমকে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সময়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি আবারও জনসমর্থনে এগিয়ে গিয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত নিউস্পোল ও রিজলভ জরিপে দেখা গেছে, লেবার পার্টি স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। এই দুই জরিপে ওয়ান নেশন ও বিরোধী জোটের সম্মিলিত ভোটের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ শতাংশে, যা আগের তুলনায় কমেছে। নিউস্পোলে এটি দুই শতাংশ এবং রিজলভ জরিপে এক শতাংশ কমেছে। এর আগে ডেমোসএইউ পরিচালিত জরিপে এই হার তুলনামূলক বেশি ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিউস্পোল ও রিজলভের ফলাফলকে বেশি নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের জনপ্রিয়তার দিক থেকে জরিপগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলরের জনপ্রিয়তা নিউস্পোল জরিপে ছয় পয়েন্ট কমে নেট মাইনাস ১৩-এ নেমে গেছে। তবে রিজলভ জরিপে তার জনপ্রিয়তা ছয় পয়েন্ট বেড়ে নেট প্লাস ১৫-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ একই সময়ে দুই জরিপে তার জনপ্রিয়তা নিয়ে বিপরীতধর্মী ফলাফল দেখা গেছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের জনপ্রিয়তা দুই জরিপেই নেতিবাচক থাকলেও পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। রিজলভ জরিপে তার নেট অনুমোদন মাইনাস ১৫ এবং নিউস্পোলে মাইনাস ১৭। যদিও এই হার তার জন্য উদ্বেগজনক, তবুও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের জন্য ভোটারদের একটি বড় অংশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করছেন। এর ফলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ কিছুটা হলেও সরকারের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না এবং লেবার পার্টি একটি ধরনের রাজনৈতিক সুরক্ষা পাচ্ছে।
১৩ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত নিউস্পোল জরিপে ১ হাজার ২৩৫ জন অংশগ্রহণ করেন। এতে লেবার পার্টি পেয়েছে ৩১ শতাংশ প্রাথমিক ভোট, যা আগের জরিপের তুলনায় অপরিবর্তিত। ওয়ান নেশন পেয়েছে ২৪ শতাংশ, যা দুই শতাংশ কমেছে। জোট পেয়েছে ২১ শতাংশ, যা অপরিবর্তিত রয়েছে। গ্রিনস এক শতাংশ বেড়ে ১৩ শতাংশ এবং অন্যান্য দল এক শতাংশ বেড়ে ১১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ওয়ান নেশন এখনও জোটের চেয়ে এগিয়ে থাকায় দ্বি-দলীয় ফলাফল সরাসরি প্রকাশ করা হয়নি। তবে ২০২৫ সালের নির্বাচনের ভোট প্রবাহ অনুযায়ী হিসাব করলে লেবার পার্টি প্রায় ৫৫–৪৫ ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই জরিপে ‘কে ভালো প্রধানমন্ত্রী’ প্রশ্নে আলবানিজ ৪৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে টেইলরের ৩৭ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছেন। যদিও আলবানিজের নেট অনুমোদন সামান্য বেড়েছে, তবুও এটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে তার সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে। অন্যদিকে টেইলর তার প্রথম নিউস্পোল জরিপের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন।
এছাড়া রাজস্ব বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছে পেট্রোলিয়াম সম্পদ ভাড়া কর বৃদ্ধি, যা ৪২ শতাংশ মানুষ সমর্থন করেছেন। এছাড়া সম্পত্তি বিনিয়োগকারীদের কর সুবিধা কমানোর পক্ষে ৩৫ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন।
১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১ হাজার ৮০৭ জনের ওপর পরিচালিত রিজলভ জরিপে লেবার পার্টি ৩২ শতাংশ ভোট পেয়ে আরও শক্ত অবস্থানে রয়েছে, যা আগের মার্চের মাঝামাঝি জরিপের তুলনায় তিন শতাংশ বেশি। জোট পেয়েছে ২৩ শতাংশ, যা এক শতাংশ বেড়েছে। ওয়ান নেশন দুই শতাংশ কমে ২২ শতাংশে নেমেছে। গ্রিনস ১২ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দুই শতাংশ কমে ৬ শতাংশ এবং অন্যান্য দল ৫ শতাংশে রয়েছে।
এই জরিপে ভোটারদের পছন্দ অনুযায়ী হিসাব করলে লেবার পার্টি ৫৫–৪৫ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের নির্বাচনের প্রবাহ অনুযায়ী হিসাব করলে ব্যবধান আরও কিছুটা বেশি হতে পারে। ‘পছন্দের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে আলবানিজ ৩৩ শতাংশ এবং টেইলর ৩২ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন, যা দুই নেতার মধ্যে প্রতিযোগিতার তীব্রতা নির্দেশ করে।
রিজলভ জরিপে নেতাদের জনপ্রিয়তার আরেকটি সূচকে দেখা গেছে, টেইলরের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে প্লাস ১৬-এ পৌঁছেছে। ন্যাশনাল দলের নেতা ম্যাট ক্যানাভান প্রথমবারের মতো প্লাস ৮ পেয়েছেন। ওয়ান নেশনের নেতা পলিন হ্যানসনের জনপ্রিয়তা চার পয়েন্ট কমে প্লাস ৬-এ নেমেছে। গ্রিনস নেতা লারিসা ওয়াটার্স তিন পয়েন্ট বেড়ে প্লাস ২ এবং আলবানিজ মাইনাস ১২-এ অপরিবর্তিত রয়েছেন।
ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে জীবনযাত্রার ব্যয়, যা ৪২ শতাংশ মানুষ উল্লেখ করেছেন। এর তুলনায় আবাসন ৮ শতাংশ, স্বাস্থ্যসেবা ৭ শতাংশ এবং অভিবাসন ৬ শতাংশ গুরুত্ব পেয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় জোট লেবার পার্টির চেয়ে এগিয়ে রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
এর আগে এপ্রিলের শুরুতে পরিচালিত স্পেকট্র স্ট্র্যাটেজি জরিপে ডানপন্থী শক্তির সম্মিলিত ভোট ৫০ শতাংশে দেখা গেলেও সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে সেই প্রবণতা কিছুটা কমে এসেছে। মার্চের শেষদিকে পরিচালিত ফ্রেশওয়াটার জরিপেও লেবার পার্টি এগিয়ে ছিল, তবে সেখানে ডানপন্থী নেতাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
ফ্রেশওয়াটার জরিপে আরও উঠে এসেছে অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে জনমত। অধিকাংশ মানুষ মনে করছেন আগামী ১২ মাসে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি আরও খারাপ হতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও জনমত স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করছেন বেশিরভাগ মানুষ। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে সেই যুদ্ধে অংশ নেয়, তাতেও জনগণের বড় অংশ আপত্তি জানিয়েছে।
এছাড়া ওই অঞ্চল থেকে শরণার্থী গ্রহণের বিরোধিতাও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, ইরান যুদ্ধ অস্ট্রেলিয়ায় সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ মানুষ ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে ১৬ শতাংশ মানুষ বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা এবং ১২ শতাংশ তেল কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফাকে দায়ী করেছেন। এই মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে, যেখানে ৫৯ শতাংশ মানুষ সরকারের পদক্ষেপে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
সাম্প্রতিক জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে লেবার পার্টি এখনও এগিয়ে থাকলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং নেতৃত্বের জনপ্রিয়তার ওঠানামা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণকে অনিশ্চিত করে তুলছে। আগামী দিনে এই প্রবণতাগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্রঃ দ্য কনভারসেশন
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au