পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করেছে প্রশাসন। মদ বিক্রিতে ৪৮ ঘণ্টার পরিবর্তে ৯৬ ঘণ্টার নিষেধাজ্ঞা, সীমান্তে চলাচল ও বাণিজ্য বন্ধ, পর্যটন এলাকায় অবস্থানে বিধিনিষেধসহ একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ভারতে নির্বাচনকালীন সময়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ভোটের আগে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মদ বিক্রি বন্ধ রাখার নিয়ম দীর্ঘদিনের। সাধারণত ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। তবে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে সেই নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা দুই দিনের পরিবর্তে চার দিন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সোমবার থেকে হঠাৎ করেই রাজ্যজুড়ে মদের দোকান বন্ধ হয়ে যায়। আবগারি দপ্তরের নির্দেশে কলকাতাসহ সব জেলায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। আগাম ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় অনেকেই বিভ্রান্ত হন। যাদবপুর, গড়িয়া, চৌরঙ্গী ও বড়বাজারসহ কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় বন্ধ দোকানের সামনে মানুষের ভিড় দেখা যায়। পরে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের বিধি মেনেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী আচরণবিধি চলাকালে কঠোর নজরদারির অংশ হিসেবে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে নগদ অর্থ, মদ, মাদকসহ বিভিন্ন প্রলোভনসামগ্রী মিলিয়ে ৪২৭ কোটির বেশি টাকার জিনিস জব্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৮১ কোটি টাকার মদ রয়েছে।
নির্বাচনের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বাণিজ্য কার্যক্রমেও। পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা এবং লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরে চার দিনের জন্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারতের নির্বাচন কমিশন ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনি কর্মকর্তার নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, ফলে ভিসাধারী যাত্রীদের পারাপার বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে বুড়িমারীতে সীমিত আকারে জরুরি চিকিৎসা ভিসাধারী যাত্রী ও ভারতীয় নাগরিকদের চলাচলের সুযোগ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে ২১ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে পর্যটন এলাকাতেও বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। দিঘা ও মন্দারমণির মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে সংশ্লিষ্ট জেলার বাইরে থেকে কেউ অবস্থান করতে পারবেন না এবং রাজনৈতিক কর্মীদের থাকার অনুমতি দেওয়া হবে না। এই নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম দফার ভোট ২৩ এপ্রিল হওয়ায় ২১ এপ্রিল থেকে ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফার ভোট ২৯ এপ্রিল উপলক্ষে ২৭ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত মদ বিক্রি বন্ধ থাকার কথা ছিল। পাশাপাশি ৪ মে ভোট গণনার দিনও রাজ্যজুড়ে ‘ড্রাই ডে’ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়েছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে।
পশ্চিমবঙ্গের ১৮তম বিধানসভা নির্বাচন দুই ধাপে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে। ২৯৪টি আসনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এবারের নির্বাচন একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনিক কড়াকড়ি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিধিনিষেধের মাত্রা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে মদ বিক্রিতে ৯৬ ঘণ্টা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।