সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান গ্রেপ্তার। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে একাধিক মেজর জেনারেলকে ঘিরে ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে তিনজন প্রভাবশালী মেজর জেনারেলকে দেশত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে আরেকজন মেজর জেনারেলকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই বৈপরীত্যপূর্ণ পদক্ষেপের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব তিনজন মেজর জেনারেলকে দেশ ছাড়ার সুযোগ করে দেয়। তাঁরা হলেন তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক হামিদুল হক, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক টি এম জোবায়ের এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব কবির আহমেদ। জানা যায়, ২০২৪ সালের মে-জুন থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তাঁদের বিদেশে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
সূত্রগুলো বলছে, জোবায়েরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রুট পরিষ্কার না হলেও, হামিদুল হক ও কবির আহমেদকে প্রথমে সীমান্তবর্তী এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁরা সেখান থেকে অন্য দেশে চলে যান। এই প্রক্রিয়ায় তাঁদের কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনজন কর্মকর্তা সাবেক সরকারের শেষ সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং তারা রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের পেছনে বিদেশি সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতেন। তাঁদের অবস্থান ছিল এমন যে, তারা সরাসরি শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংবেদনশীল অনেক বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এই কারণেই তাঁদের দেশত্যাগের সুযোগ করে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন আরেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সংস্থা জাতীয় টেলিযোগাযোগ নজরদারি কেন্দ্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট রাতে তাঁকে সেনাবাহিনীর সদস্যরাই গ্রেপ্তার করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে এই গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়।
গ্রেপ্তারের আগে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সেনা সদর দপ্তর থেকে তাঁর মোবাইলে দুটি ফোনকল আসে। প্রথম কলটিতে তাঁকে জানানো হয়, প্রধান তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন। দ্বিতীয় কলটিতে বলা হয়, একটি গাড়ি তাঁর জন্য পাঠানো হচ্ছে এবং তাঁকে তাতে উঠতে হবে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি পরিবারকে জানান, তিনি পালানোর চেষ্টা করবেন না এবং যা ঘটবে, তার মুখোমুখি হবেন। একই সঙ্গে তিনি পরিবারকে সতর্ক করে বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনি ফিরে না এলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে।
গ্রেপ্তারের পর তাঁকে একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, যা গোয়েন্দা সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন একটি নিরাপদ আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। সেখানে তাঁকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষে রাখা হয়। পরদিন তাঁর সরকারি বাসভবনে সেনাবাহিনীর একটি বড় দল অভিযান চালায়। পুরো বাড়ি তল্লাশি করা হয় এবং বিভিন্ন আসবাবপত্র ভেঙে ফেলা হয়। কী খোঁজা হচ্ছিল, তা স্পষ্ট না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা নথি উদ্ধারের চেষ্টা চলছিল।
জিয়াউল আহসান যে সংস্থার দায়িত্বে ছিলেন, সেটি মূলত ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে যোগাযোগ নজরদারি করত। ফলে রাষ্ট্রীয় বা সামরিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন সম্পর্কেও তাঁর কাছে তথ্য থাকার সম্ভাবনা ছিল। এই কারণে তিনি কোনো সংবেদনশীল তথ্য জানতেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে কিছু মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তবে অন্য তিন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করছেন, সেনাবাহিনীর ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কৌশলগত বা রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন এবং সেই প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য বিদেশি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসায় পুরো ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
একদিকে কিছু কর্মকর্তাকে দেশত্যাগের সুযোগ দেওয়া এবং অন্যদিকে একজনকে কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা, এই দুই ভিন্ন পদক্ষেপ দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ