আরব দেশগুলোতে কি প্রভাব হারাচ্ছেন ট্রাম্প।
মেলবোর্ন, ১৭ আগষ্ট: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চললেও এখনো কোনো কার্যকর সমাধানের পথ না বের হওয়ায় মার্কিন মিত্র হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং যুদ্ধ ও শান্তিচুক্তি নিয়ে তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো এখন নিজেদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল নিয়ে এই পাঁচ দেশ গভীরভাবে অসন্তুষ্ট। যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলে যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে, তার জন্য আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করছেন।
এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছেন, অথচ এর মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে। ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক ফিরাস মাকসাদও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যেটি তারা কখনোই চায়নি। তাদের কাছে ট্রাম্পের ইরান নীতি অস্থির ও অপ্রত্যাশিত বলে মনে হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলো সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের বাব আল-মানদাব প্রণালি অবরোধের হুমকি দেওয়ায় সৌদি আরবকে তাদের তেল পরিবহনের রুট পরিবর্তন করতে হয়েছে।
ফলে যুদ্ধের সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ ওয়াশিংটনের ওপর নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ইউরোপের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আঞ্চলিক দেশগুলোর আস্থা কমে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ বদর আল-সাইফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুনে হওয়া সমঝোতা স্মারকে উপসাগরীয় অঞ্চলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর একটি হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং অন্যটি আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন। এসব বিষয় বাদ পড়ার কারণে ওই সমঝোতা শেষ পর্যন্ত টেকেনি বলে তিনি মনে করেন।
মার্কিন ঘাঁটি নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠছে
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে এসব ঘাঁটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এসব ঘাঁটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তার পাশাপাশি ঝুঁকির কারণও হয়ে উঠতে পারে বলে আঞ্চলিক পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখেও আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও বৈচিত্র্যময় ও স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ওই অঞ্চলের অংশীদারদের সম্পর্ক চমৎকার। তাদের দাবি, ইরানের আগ্রাসী নীতির কারণেই দেশটি আঞ্চলিকভাবে একা হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন সরকারের পক্ষ থেকে মার্কিন নীতি বা ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
তবে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার মাত্রা নতুন করে বিবেচনার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব কতটা অটুট থাকবে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।