বিশ্ব

সমীক্ষাকে ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বললেন মমতা, ভোটের ফল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী তৃণমূল

  • 5:37 am - May 01, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩ বার
মমতা ব্যানার্জী ও শুভেন্দু অধিকারী আজ মুখোমুখি ভোটের লড়াইতে। ছবি: বিবিসি

মেলবোর্ন, ১ মে- পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বুথফেরত সমীক্ষা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যজুড়ে। ভোট শেষ হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে যে সমীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়, তা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দাবি, এই সমীক্ষাগুলো জনমতের নিরপেক্ষ চিত্র নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত একটি পরিকল্পিত প্রচারণার অংশ।

ভোটের দ্বিতীয় দফা শেষ হওয়ার পর বুধবার সন্ধ্যা থেকেই একের পর এক বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশ হতে থাকে। অধিকাংশ সমীক্ষায় দেখা যায়, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের অগ্রগতি করেছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগোচ্ছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। কিছু সমীক্ষায় বিজেপিকে ১৫০-এর বেশি আসন দেওয়ার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়। এই ফলাফল প্রকাশের পরই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক।

এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি প্রথমেই ভোটারদের ধন্যবাদ জানান। তার বক্তব্যে তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতি, রোদ, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়া এবং নানা ধরনের চাপের মধ্যেও মানুষ যেভাবে ভোট দিয়েছেন, তা প্রশংসার যোগ্য। একই সঙ্গে তিনি দলের কর্মীদেরও ধন্যবাদ জানান, যারা মাঠপর্যায়ে থেকে কাজ করেছেন এবং নানা ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন।

তবে তার বক্তব্যের মূল অংশ জুড়ে ছিল বুথফেরত সমীক্ষা নিয়ে তীব্র সমালোচনা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, এই সমীক্ষাগুলো নিরপেক্ষভাবে তৈরি হয়নি। তার দাবি, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থে এগুলো তৈরি ও প্রচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিজেপি অর্থের প্রভাব ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত করেছে এবং চাপ সৃষ্টি করে এমন ফলাফল প্রচার করিয়েছে, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না।

মমতা আরও বলেন, তার কাছে তথ্য রয়েছে যে, নির্দিষ্ট সময় থেকেই এসব সমীক্ষা প্রচারের জন্য পরিকল্পিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তার মতে, এটি শুধুমাত্র জনমত প্রভাবিত করার কৌশল নয়, বরং ভোটের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একটি প্রচেষ্টা।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রেকর্ডভাঙা ভোট। ছবিঃ সংগৃহীত

তিনি দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেস এই নির্বাচনে ২২৬টির বেশি আসন পেতে চলেছে। এমনকি তিনি বলেন, ২৩০ আসন পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তার এই আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে তিনি মাঠপর্যায়ের জনসমর্থন ও দলের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, নির্বাচন চলাকালীন সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার দাবি, অনেক জায়গায় তৃণমূল কর্মীদের ওপর একতরফা চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাদেরকে ভয় দেখানো হয়েছে। তিনি বলেন, ভোটের সময় বিভিন্ন এলাকায় শাসক দলের কর্মীরা হামলা ও বাধার মুখে পড়েছেন।

তিনি বিশেষভাবে কয়েকটি এলাকার নাম উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভাটপাড়া, নোয়াপাড়া, জগদ্দল এবং ভবানীপুরের মতো এলাকায় তল্লাশি অভিযান এবং গ্রেফতার চালিয়ে তৃণমূল কর্মীদের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে দলের এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি।

একই সঙ্গে তিনি একজন ভোটারের মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরেন। উদয়নারায়ণপুর এলাকায় ভোট দিতে গিয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয় বলে তিনি জানান। এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করে তিনি নিহত ব্যক্তির পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও অভিযোগ করেন, প্রশাসনের একটি অংশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। তার মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজ্যের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীকেও তিনি কটাক্ষ করেন। তার অভিযোগ, ভোটের সময় দেওয়া কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করে না এবং বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তিনি দলের কর্মীদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, ভোট গণনার দিন সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। গণনাকেন্দ্রে কোনো অবস্থাতেই শিথিলতা দেখানো যাবে না। তার নির্দেশ অনুযায়ী, প্রার্থীদের অবশ্যই নিজ নিজ গণনাকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় ধরে গণনাকেন্দ্রে অবস্থান করতে হবে। কোনো সন্দেহজনক পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি কর্মীদের শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানান।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়েও মন্তব্য করেন। তার মতে, বর্তমানে রাজনৈতিক আলোচনায় যেভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালাগালি এবং পরিবারকে টেনে আনা হচ্ছে, তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, স্বাধীনতার নামে যেভাবে অপপ্রচার চলছে, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নষ্ট করছে।

তিনি আরও বলেন, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু নেতা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। যদিও তিনি এটিকে ব্যঙ্গ করে উল্লেখ করেন, তবুও বলেন যে রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ থাকলে এসব উদ্যোগ ইতিবাচক হতে পারে, তবে তা যেন কেবল রাজনৈতিক নাটকে সীমাবদ্ধ না থাকে।

তার বক্তব্যে একাধিকবার তিনি জোর দেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, এসব প্রচারণা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে, কারণ জনগণ বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও এই সময় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। রাজ্যে ভোট চলাকালীন সময়ে একাধিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে সরাসরি চিঠিও লেখেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে। তার অভিযোগ ছিল, রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল করা হয়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

এই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টেও একাধিক মামলা দায়েরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভোট গণনা কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গণনাকেন্দ্রের স্থান পরিবর্তন এবং কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে যে, ভোট গণনা আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গণনাকেন্দ্রে প্রবেশের জন্য কঠোর পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যেখানে কিউআর কোড যুক্ত পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাউকে গণনাকক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে।

এছাড়া গণনাকেন্দ্র ও স্ট্রংরুমের নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। শতাধিক কোম্পানি বাহিনী বিভিন্ন জেলায় মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের ভোট গণনা মোট ৮৭টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় কম। এর ফলে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে কমিশনের ধারণা।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন ভোটের ফল ঘোষণার আগ মুহূর্তে চরম উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে। একদিকে বুথফেরত সমীক্ষা ঘিরে বিতর্ক, অন্যদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক অভিযোগের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবল একটি নির্বাচনের ফলাফল নয়, বরং রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখন সবার নজর আগামী ৪ মে অনুষ্ঠিতব্য ভোট গণনার দিকে, যেখানে আসল ফলাফল স্পষ্ট হবে এবং সব জল্পনার অবসান ঘটবে।

এই শাখার আরও খবর

সংরক্ষিত নারী আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪৯ জন নির্বাচিত, গেজেট প্রকাশ

মেলবোর্ন, ১ মে- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪৯ জন প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার (৩০…

বছর শেষে দেশে ফিরতে আশাবাদী সাকিব

মেলবোর্ন, ১ মে- দীর্ঘ সময় ধরে দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা বাংলাদেশ জাতীয় দলের তারকা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান অবশেষে নিজেই সম্ভাব্য সময়সীমার ইঙ্গিত…

নিজ দেশে নিপীড়নের শঙ্কার কথা জানালে ভিসা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র

মেলবোর্ন, ১ মে- যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসন। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ভিসা…

সংস্কারের নামে নির্বাচন বাধাগ্রস্তের আশঙ্কা ছিল: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মেলবোর্ন, ১ মে- জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নির্বাচন নিশ্চিত করার স্বার্থেই তারা অনেক বিষয়ে আপস করেছিলেন…

৩৭ হাজার কোটির ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করল বিমান

মেলবোর্ন, ১ মে- বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং-এর কাছ থেকে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত…

ইরানে শক্তিশালী হামলার জন্য ট্রাম্পের অনুমতির অপেক্ষায় সেন্টকম

মেলবোর্ন, ৩০ এপ্রিল- ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে দেশটির বিরুদ্ধে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক হামলার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au