সংস্কৃতির গলা চেপে ধরেছে ভয়ের রাজনীতি। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন, ২২ মে- ২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে এক নীরব নিপীড়ন। নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে এনে যে অন্তর্বর্তী প্রশাসন ক্ষমতা নিল, তার নেতৃত্বে থাকা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সময়ে শিল্পী, লেখক, নাট্যকর্মী, সংগীতশিল্পী এবং কলাকুশলীরা পড়েছেন সরাসরি আঘাতের মুখে। মব ভায়োলেন্স, মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা, লুটপাট আর অর্থনৈতিক অবরোধ মিলে সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশটাই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে শিল্পী নির্যাতনের পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ শিল্পী কল্যাণ সমিতি, নাট্য সংগঠন ঐক্যজোট, সংগীত শিল্পী সংসদ এবং বিভিন্ন জেলা শিল্পকলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দুই হাজারের বেশি শিল্পী ও কলাকুশলী সরাসরি নির্যাতন, হামলা, হুমকি এবং মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, ২১৭ জনকে চাকরি ও কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে। ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়ে অবস্থা আরও খারাপ। রাজশাহী, কুমিল্লা, খুলনা, বরিশালে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয় ভাঙচুর করে নথিপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাংলা একাডেমি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ১৯টি প্রকাশনা সংস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। সাহিত্য সাময়িকী, লিটল ম্যাগাজিন, সাংস্কৃতিক পত্রিকা ছাপা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। সম্পাদক ও লেখকদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে ৪১টি। ফলে তরুণ লেখকরা লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশ লেখক শিবিরের জরিপ অনুযায়ী, নিরাপত্তাহীনতায় লেখালেখি ছেড়েছেন ৮৩ জন তরুণ লেখক।
চলচ্চিত্র ও নাটকের কলাকুশলীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। এফডিসিতে শুটিং বন্ধ, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রায় বাদ দিয়ে দিয়েছে। এতে প্রায় ১২ হাজার কলাকুশলী বেকার হয়ে পড়েছেন। শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, ১,২০০ জনের বেশি বয়স্ক শিল্পী তাদের ভাতা ও চিকিৎসা সহায়তা পাননি। অনেকেই চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন, যার কোনো রাষ্ট্রীয় হিসাব নেই।
ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপরও আঘাত এসেছে সমানভাবে। মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ২৮টি স্থাপনা, ম্যুরাল ও ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে। কুমিল্লার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের নামে আয়োজিত অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে বিতর্কের ভয়ে। শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে তালা ঝুলেছে মাসের পর মাস। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনার লোকসঙ্গীত ও পল্লীগীতির আসর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তার অজুহাতে।
এই পুরো চিত্রের পেছনে কাজ করেছে মব ভায়োলেন্স ও ভয়ের সংস্কৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্লাবগুলোতে শিক্ষক, ছাত্র, শিল্পীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন, কেউ দেশ ছেড়েছেন। সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ না থাকলে একটি জাতি ধীরে ধীরে তার ভাষা, ইতিহাস ও আত্মপরিচয় হারায়।
শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনে বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চা গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জেলা পর্যায়ের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো সক্রিয় ছিল। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশি শিল্পীরা সম্মান পেয়েছেন। সেই ধারা ভেঙে পড়েছে প্রায় দুই বছরের বছরের অরাজকতায়।
রাষ্ট্রের দায় ছিল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বাধীনতা রক্ষা করা। শিল্পকলা কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গ্রেপ্তার হওয়া শিল্পীদের মুক্তি দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পী ও প্রতিষ্ঠানকে পুনর্বাসন করা, মব ভায়োলেন্সে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা। কিন্তু অন্তর্বর্তী প্রশাসন এসবের কিছুই করেনি। বরং তাদের নীরবতা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নিপীড়নকে আরও উৎসাহিত করেছে।
সংস্কৃতি মরলে জাতি মরে। শিল্পী নির্যাতিত হলে সমাজ বোবা হয়ে যায়। আজকে যে কলম থেমে যাচ্ছে, যে সুর স্তব্ধ হচ্ছে, যে মঞ্চ ভাঙছে—তার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। ইতিহাস লিখে রাখবে, কীভাবে একটি অনির্বাচিত, অসাংবিধানিক প্রশাসন বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর নীরব যুদ্ধ চালিয়েছে। আমরা যেন এই নিপীড়নের কথা ভুলে না যাই।
লেখক- সরদার সেলিম রেজা, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র