শ্রীলঙ্কায় বাড়ছে অনলাইন স্ক্যাম চক্র, এক বছরে গ্রেপ্তার হাজারের বেশি বিদেশি। ছবিঃ এএফপি
মেলবোর্ন, ২২ মে- দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে অনলাইন প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চলার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে শ্রীলঙ্কা। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, চলতি বছরে অনলাইন জালিয়াতি ও সাইবার প্রতারণা চক্রের কার্যক্রম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। একইসঙ্গে এ ধরনের অপরাধে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার বিদেশির সংখ্যাও আগের দুই বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে।
শ্রীলঙ্কা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সাইবার অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে এক হাজারের বেশি বিদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের অধিকাংশই চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের নাগরিক। পুলিশের মুখপাত্র ফ্রেডরিক উটলার বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ২০২৪ সালে যেখানে মোট ৪৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, সেখানে এ বছর সেই সংখ্যা ইতোমধ্যে হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা আরও কম ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনলাইন প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু হওয়ায় এসব অপরাধী নেটওয়ার্ক নতুন নিরাপদ ঘাঁটি খুঁজছে। সেই সুযোগে শ্রীলঙ্কা এখন তাদের নতুন কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে।
সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার কাস্টমস কর্মকর্তারা নয়জন চীনা নাগরিককে আটক করেন, যারা শত শত ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ পাচারের চেষ্টা করছিল। কর্মকর্তাদের সন্দেহ, এসব যন্ত্রপাতি বৃহৎ পরিসরের অনলাইন প্রতারণা পরিচালনায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আনা হচ্ছিল।
গত কয়েক বছরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে কম্বোডিয়া ও মিয়ানমার, অনলাইন প্রতারণা চক্রের বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বিশাল সুরক্ষিত কম্পাউন্ডের ভেতরে পরিচালিত এসব চক্রে বিদেশিদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের মারধর, নির্যাতন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক সাইবার অপরাধে যুক্ত করা হয়।
এই প্রতারণার প্রধান লক্ষ্যবস্তু সাধারণত ইংরেজিভাষী দেশের নাগরিকরা। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের মানুষকে প্রেমের সম্পর্ক, উচ্চ মুনাফার বিনিয়োগ কিংবা আকর্ষণীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা নিজেদের পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়।
গত বছরের শেষ দিকে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তে একটি ভুয়া অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ অফিসও শনাক্ত করা হয়, যা একটি প্রতারণা চক্র পরিচালনার অংশ ছিল।
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার পর কম্বোডিয়া সরকার অনলাইন প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার চাপের মুখে শত শত প্রতারণা কেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছে এবং হাজার হাজার সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার ও নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এসব অপরাধী চক্র কেবল নতুন দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। কলম্বোয় অবস্থিত চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অভিযান জোরদারের পর শ্রীলঙ্কায় অবৈধ কার্যক্রম বেড়ে গেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “চীন সরকার এ প্রবণতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।” একইসঙ্গে শ্রীলঙ্কার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও দেয় বেইজিং।
বিশ্লেষক জোহান রেবার্ট ও নিকোলা নিক্সন ‘লোয়ি ইন্টারপ্রিটার’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেন, প্রতারণা চক্রগুলো নিজেদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপ বাড়লেই তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে নতুন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
তাদের মতে, পর্যটক আকর্ষণে শ্রীলঙ্কার উন্মুক্ত নীতি প্রতারণা চক্রগুলোর জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। চীন, ভারত, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা বিনা খরচে ৩০ দিনের ভিসায় শ্রীলঙ্কায় প্রবেশ করতে পারেন। পরে ছয় মাস পর্যন্ত ভিসা বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, পর্যটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই উন্মুক্ত নীতিই সীমান্ত পেরিয়ে দ্রুত লোকজন সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। একইসঙ্গে হোটেল, গেস্টহাউস ও অ্যাপার্টমেন্টগুলো ছোট আকারের মোবাইল প্রতারণা চক্র পরিচালনার জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠছে।
তারা আরও বলেন, শ্রীলঙ্কার প্রায় সব অঞ্চলে শক্তিশালী ডিজিটাল সংযোগ থাকায় যেকোনো জায়গা থেকেই অনলাইন প্রতারণা পরিচালনা করা সম্ভব। বড় কম্পাউন্ডের বদলে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দল এখন সহজে স্থান পরিবর্তন করতে পারছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থায় শ্রীলঙ্কা পুলিশ বাড়ির মালিকদের সতর্ক করেছে। সন্দেহভাজন প্রতারণা চক্রের কাছে ভিলা বা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দিলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশের সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট উটলার বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এসব চক্রের ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অসংখ্য অভিযোগ পাচ্ছে পুলিশ।
তিনি জানান, চলতি মাসের শুরুতে উপকূলীয় গল ও মাতারা জেলায় এক রাতেই পাঁচটি অভিযান চালানো হয়। এতে ভারতের ১৯২ জন এবং নেপালের ২৯ জন নাগরিককে আটক করা হয়। গত সপ্তাহে কলম্বোর কাছে আরও ২৮০ বিদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মার্চ মাসে একটি প্রতারণা কেন্দ্র থেকে ১৩৫ জন চীনা নাগরিককে আটক করা হয়েছিল।
এ ছাড়া সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার ট্রেজারিতে সংঘটিত একটি সাইবার হামলার পেছনেও বিদেশি প্রতারণা চক্র জড়িত কি না, তা তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ। ওই হামলায় প্রায় ২৫ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ বাড়তে থাকায় এখন অভিবাসন বিভাগও তদন্তে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, “পুলিশের তদন্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের কর্মকর্তাদেরও সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে।”
জাতিসংঘের চলতি বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে অন্তত তিন লাখ মানুষকে প্রতারণা চক্র পরিচালিত কম্পাউন্ডে পাচার করা হয়েছে।
যদিও শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত বিদেশিদের দেশটিতে এনে জোরপূর্বক কাজে লাগানোর সুস্পষ্ট প্রমাণ পায়নি। তবে গত এক বছরে বিভিন্ন দেশে পরিচালিত প্রতারণা কেন্দ্র থেকে বহু শ্রীলঙ্কান নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে।
সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট উটলার বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থানকারী বিদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে এবং অনলাইন অপরাধে জড়িতদের আদালতের মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীলঙ্কা এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণা চক্রের স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেন, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের মতো পরিস্থিতি এড়াতে এখনই কঠোর সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ