কঙ্গোর এতিমখানায় ইবোলার থাবা, দুই শিশুর মৃত্যুতে আতঙ্ক ।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ জুন- কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলে চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাব নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইতুরি প্রদেশের বুনিয়া শহরের একটি এতিমখানায় ইবোলা সংক্রমণে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নবজাতক, যে জন্মের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাণ হারায়। একই সঙ্গে এতিমখানাটির আরও কয়েকজন শিশু ও সেবাকর্মীর শরীরে ইবোলা শনাক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সতর্কতা জোরদার করেছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ দিকে বাসওয়াজা নামের এক নবজাতকের মা মারা যান। এরপর শিশুটিকে বুনিয়ার একটি গির্জা পরিচালিত এতিমখানায় আশ্রয় দেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পরপরই তার জ্বর দেখা দেয় এবং শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। কয়েক দিনের মধ্যেই শিশুটি মারা যায়। পরবর্তীতে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, সে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল।
নবজাতকের মৃত্যুর পর এতিমখানাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যকর্মীরা দ্রুত শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করেন। পরে আরও ছয়জন শিশুর মধ্যে ইবোলার উপসর্গ শনাক্ত হয়। ৬৯ জন শিশুর ওই আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আক্রান্ত ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরীক্ষার পর পাঁচ শিশুর ফলাফল নেগেটিভ আসায় তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
তবে সংকট আরও গভীর হয় যখন এক বছরের কম বয়সী আরেকটি শিশু, স্থানীয়ভাবে ‘শেরি’ নামে পরিচিত, ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন বুনিয়ার ইভানজেলিক্যাল মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসক ডা. ফ্রেডি কিবওয়ানা।
শুধু শিশুরাই নয়, আক্রান্ত শিশুদের পরিচর্যায় যুক্ত কয়েকজন সেবাকর্মীও সংক্রমিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ক্যাথলিক সিস্টার রয়েছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইবোলা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল, যেমন রক্ত, লালা, বমি ও মলের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও সংক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, নবজাতক বাসওয়াজা হয়তো মায়ের গর্ভে থাকতেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। কারণ ইবোলা ভাইরাস গর্ভের শিশুকে ঘিরে থাকা তরল, প্লাসেন্টা এবং বুকের দুধেও পাওয়া যেতে পারে। ফলে গর্ভাবস্থা ও জন্মের সময় সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবে কঙ্গোতে প্রায় ৬০০ জনের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত অন্তত ১১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের প্রায় ১৭ শতাংশই শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতুরি অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সংঘাত, অপুষ্টি এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির হার ৫০ শতাংশের বেশি হওয়ায় ইবোলার মতো প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিন এতিমখানাটি পরিদর্শন করছেন। আক্রান্তদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং নতুন সংক্রমণ শনাক্তে নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে। মানবিক সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এই সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং বহু অসহায় শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সুত্রঃ রয়টার্স