বাংলাদেশ

হামে ৬৫২ শিশুর মৃত্যু, তিন মাসেও কেন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার

নিয়ন্ত্রণে আসেনি হাম পরিস্থিতি, আক্রান্ত ৮৫ হাজারের বেশি; প্রাণ হারিয়েছে ৬৫২ শিশু, অব্যবস্থাপনার অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের

  • 2:35 pm - June 15, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩১ বার
হামের উপসর্গে আরও মৃত্যু, এক দিনে , ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৫ জুন- বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়া হাম পরিস্থিতি তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। দেশে এক সময় প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া এই সংক্রামক রোগ আবারও মহামারি আকারে ফিরে আসায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনস্বাস্থ্য মহলে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৮৫ হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৬৫২ শিশু। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটির বিস্তার শুরু হওয়ার পর দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাত না। তাদের অভিযোগ, সময়মতো হামকে মহামারি ঘোষণা না করা, স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি না করা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে বহু শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘‘সরকারের মিস ম্যানেজমেন্টের কারণেই এত মৃত্যু হয়েছে। শুরুতেই যদি বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতো, তাহলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এতটা বাড়ত না।’’

তার মতে, হাম ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এটিকে মহামারি ঘোষণা করে জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি করা প্রয়োজন ছিল। এতে কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতো এবং স্বাস্থ্যখাতের সব সম্পদ ও জনবলকে একযোগে কাজে লাগানো যেত।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত দাবি করেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারত। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’’

হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, শয্যা সংকট

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড় কমেনি। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলো প্রায় পূর্ণ।

হাসপাতালগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক অভিভাবক দিনের পর দিন সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। কেউ সন্তান হারানোর শোক নিয়ে আরেক সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন, আবার কেউ চিকিৎসা ব্যয়ের ভার বহন করতে গিয়ে ঋণের বোঝা কাঁধে নিচ্ছেন।

সালমা বেগম ও আব্দুল গণি দম্পতির গল্প সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। কয়েক সপ্তাহ আগে হামের উপসর্গ নিয়ে তাদের আড়াই বছর বয়সী ছেলে ইব্রাহীম মারা যায়। জ্বর, ঠাণ্ডা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে প্রথমে স্থানীয় ক্লিনিক, পরে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

বড় সন্তানের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই তাদের আট মাস বয়সী আরেক সন্তানের শরীরেও দেখা দেয় একই ধরনের উপসর্গ। বর্তমানে শিশুটি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

শিশুটির বাবা আব্দুল গণি জানান, চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে তিনি ধার-দেনায় জড়িয়ে পড়েছেন। একজন দিনমজুর হিসেবে তার পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়  বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

একই হাসপাতালে ভর্তি থাকা ফরিদপুরের বাসিন্দা সাইমা খান জানান, তার মেয়েকে গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে আইসিইউতে নিতে হয়। আশপাশে একের পর এক শিশুর মৃত্যু দেখতে দেখতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তবে কয়েকদিন নিবিড় পরিচর্যার পর তার মেয়ের অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

জটিলতা বাড়ার পর রাজধানীতে আসছেন রোগীরা

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, শুরুতে রোগীর চাপ আরও বেশি ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

তার ভাষ্য, অনেক পরিবার প্রথমদিকে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা নেয়। কিন্তু জটিলতা দেখা দেওয়ার পর রাজধানীতে আসে। তখন অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে চিকিৎসা দিয়েও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।

বিশেষ করে নিউমোনিয়া, মারাত্মক শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা ও অপুষ্টিজনিত জটিলতা নিয়ে আসা শিশুদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।

কীভাবে ফিরে এলো প্রায় নির্মূল হওয়া হাম?

বাংলাদেশে একসময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হাম প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এমআর ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং বিপুলসংখ্যক শিশুর টিকার আওতার বাইরে থেকে যাওয়ার কারণে আবারও রোগটি বিস্তার লাভ করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি বলেছেন, ২০২০ সালের পর নিয়মিত এমআর টিকাদান ক্যাম্পেইন না হওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

সরকারের দাবি, বিগত সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকাদান কার্যক্রমে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখন দেখা যাচ্ছে।

এ কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে হাম পরিস্থিতি কেন এত ভয়াবহ রূপ নিল, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়নের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছেও তদন্ত সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

মহামারি ঘোষণা না করা ছিল বড় ভুল?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, হামকে মহামারি ঘোষণা না করা ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল।

ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘‘আমরা শুরু থেকেই বলেছিলাম এটিকে মহামারি ঘোষণা করতে হবে। তা করলে সব খাত থেকে সমন্বিতভাবে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নেওয়া যেত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’’

তার মতে, মহামারি ঘোষণা করা হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ, আইসিইউ শয্যা বৃদ্ধি, জরুরি ওষুধ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং গণসচেতনতা কার্যক্রম আরও দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো।

তিনি আরও বলেন, ‘‘মহামারি ঘোষণা করা মানেই সরকারের ব্যর্থতা নয়। বরং দ্রুত ঘোষণা দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারলে সেটি সরকারের সফলতা হিসেবেই বিবেচিত হতো।’’

সরকারের অবস্থান

সরকার অবশ্য এখনো দাবি করছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ বলয় বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দুই মাস আগে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় লাখ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো শতভাগ শিশু টিকার আওতায় আসেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব এলাকায় আক্রান্তের হার বেশি, সেখানে বিশেষ নজরদারি ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ডেঙ্গু

হাম পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে। বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই সময়ে দুটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করা সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তাদের মতে, এখনই জরুরি ভিত্তিতে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো, শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করা গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা না গেলে আগামী মাসগুলোতেও হামে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। ফলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি হাজারো পরিবারকে নতুন করে দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

এই শাখার আরও খবর

হায়দ্রাবাদে আটক সাত বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাচ্ছে ভারত

মেলবোর্ন, ১৫ জুন- ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের হায়দ্রাবাদে অবৈধভাবে বসবাসের অভিযোগে সাত বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে…

সিরিয়ায় নিখোঁজ আইএস-সংশ্লিষ্ট নারী-শিশুকে ফেরাতে সেভ দ্য চিলড্রেনের আহ্বান

মেলবোর্ন, ১৫ জুন- সিরিয়ায় আটক থাকা আইএস-সংশ্লিষ্ট এক অস্ট্রেলীয় নারী ও তার প্রতিবন্ধী শিশুকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য অস্ট্রেলিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটির প্রভাবশালী…

৮০ ঘণ্টা পর সীমান্ত থেকে ১২ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ

মেলবোর্ন, ১৬ জুন- কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে টানা প্রায় ৮০ ঘণ্টা ধরে শূন্যরেখায় আটকে থাকা চার শিশু ও চার নারীসহ ১২ জনকে অবশেষে নিজেদের হেফাজতে ফিরিয়ে…

ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত নরওয়ের যুবরাজের সৎপুত্র, ৪ বছরের কারাদণ্ড

মেলবোর্ন, ১৫ জুন- নরওয়ের যুবরাজ হাকনের সৎপুত্র মারিউস বর্গ হয়বি ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা এবং অন্যান্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। দেশটির রাজধানী অসলোর একটি আদালত সোমবার…

এক সফরে দুই শীর্ষ বৈঠক, চীনের নজরে বাংলাদেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ

মেলবোর্ন, ১৫ জুন- বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ঢাকা–বেইজিং সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ, সরকারি সফর এবং কৌশলগত আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে…

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি চূড়ান্ত, জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর শুক্রবার

মেলবোর্ন, ১৫ জুন- দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মধ্যস্থতাকারীরা। আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au