যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের খসড়া ফাঁস । ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৭ জুন- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তির একটি ১৪ দফার খসড়া প্রকাশ্যে এসেছে। ফাঁস হওয়া এই সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিল গঠন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন কাঠামোয় আলোচনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম বরাতে প্রকাশিত খসড়া অনুযায়ী, স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অবিলম্বে সব ধরনের সামরিক সংঘাত বন্ধ করার ঘোষণা দেবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতময় অঞ্চল, বিশেষ করে লেবাননকে ঘিরে চলমান উত্তেজনাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
খসড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, দুই দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে। এছাড়া স্মারক স্বাক্ষরের পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমুদ্রপথে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচল পুনঃস্থাপন করা হবে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে ইরান।
অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা। যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এই তহবিলে অর্থায়ন করবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। এই অর্থ জ্বালানি, পরিবহন, শিল্প, অবকাঠামো ও যুদ্ধবিধ্বস্ত স্থাপনা পুনর্নির্মাণে ব্যয় করা হতে পারে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে। পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ও অর্থও পর্যায়ক্রমে মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ইরান পুনরায় প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য স্পর্শকাতর পারমাণবিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় নির্ধারণ করা হবে।
চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও উভয় পক্ষের প্রতিশ্রুতি রক্ষা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থাও গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদনের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এটি এখনো চূড়ান্ত নথি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খসড়া পুরোপুরি চূড়ান্ত সংস্করণকে প্রতিফলিত করে না। অন্যদিকে ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তাও নথিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে খসড়ার বিভিন্ন ধারা ও ভাষায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সমঝোতা বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কেই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সুত্রঃ সিএনএন