মেলবোর্ন, ৪ জুলাই- স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রোটিন সাপ্লিমেন্টের ব্যবহারও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফার্মেসি বা স্বাস্থ্যপণ্য বিক্রির দোকানে গেলেই দেখা যায় হুই, প্ল্যান্ট-বেইজড ও কোলাজেনসহ নানা ধরনের প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট। তবে সব ধরনের প্রোটিনের কাজ এক নয়। তাই নিজের প্রয়োজন, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে সঠিক প্রোটিন নির্বাচন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোটিন মূলত অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে গঠিত, যা শরীরের কোষ গঠন, ক্ষত সারানো, পেশি মেরামত এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত তিন ধরনের প্রোটিন হলো হুই প্রোটিন, প্ল্যান্ট-বেইজড প্রোটিন এবং কোলাজেন প্রোটিন।
হুই প্রোটিন তৈরি হয় দুধজাত উপাদান থেকে এবং এটি দ্রুত শরীরে শোষিত হয়। ফলে ব্যায়ামের পর পেশির পুনর্গঠন ও শক্তি ফিরিয়ে আনতে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে প্ল্যান্ট-বেইজড প্রোটিন তৈরি হয় সয়াবিন, ডাল, শস্য ও বিভিন্ন বীজ থেকে। যারা নিরামিষভোজী, ভেগান অথবা দুগ্ধজাত খাবারে অ্যালার্জি বা অসহিষ্ণুতায় ভোগেন, তাদের জন্য এটি ভালো বিকল্প।
অন্যদিকে কোলাজেন একটি বিশেষ ধরনের প্রোটিন, যা মানুষের শরীরের ত্বক, হাড়, লিগামেন্ট, টেনডন ও সংযোজক টিস্যুর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে কোলাজেনের উৎপাদন কমে যায়। তাই অনেকেই কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন।
প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এটিপি সায়েন্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ম্যাট লেগ বলেন, সব ধরনের প্রোটিনের উদ্দেশ্য এক নয়। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক চাহিদা ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী প্রোটিন নির্বাচন করা উচিত। তার মতে, হুই ও প্ল্যান্ট প্রোটিন মূলত শরীরের দৈনন্দিন প্রোটিনের চাহিদা পূরণ এবং পেশি পুনর্গঠনে সহায়তা করে, আর কোলাজেন শরীরের সংযোজক টিস্যু ও ত্বকের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের আগে খাদ্যতালিকার দিকে নজর দেওয়া উচিত। মাছ, মাংস, মুরগি, ডিম, গ্রিক দই, পনির, ডাল, বাদাম ও বিভিন্ন বীজ থেকে পর্যাপ্ত প্রোটিন পাওয়া সম্ভব। যদি এসব খাবার থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিনের ঘাটতি থেকে যায়, তখনই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের কথা ভাবা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোলাজেন পাওয়া যায় হাড়ের ঝোল, ধীরে রান্না করা মাংস ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাংস থেকে। তবে আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে এসব খাবার খুব কম খাওয়া হয়। ফলে অনেকেই কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর করেন। যারা হুই প্রোটিন গ্রহণ করতে পারেন না, তাদের জন্যও এটি একটি বিকল্প হতে পারে।
প্ল্যান্ট-বেইজড প্রোটিন নিয়ে প্রচলিত ধারণা হলো এটি হুই প্রোটিনের তুলনায় কম কার্যকর। তবে ম্যাট লেগ বলেন, বাস্তবে দুই ধরনের প্রোটিনেই প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। শুধু কিছু অ্যামিনো অ্যাসিডের অনুপাত ও ঘনত্বে পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে অনেক প্ল্যান্ট প্রোটিনে একাধিক উদ্ভিজ্জ উৎসের সমন্বয় করা হয়, যাতে এটি আরও পরিপূর্ণ অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করতে পারে।
প্রতিদিন একজন মানুষের কতটুকু প্রোটিন প্রয়োজন, তা বয়স, লিঙ্গ, ওজন ও শারীরিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে। অস্ট্রেলিয়ার পুষ্টি নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৩৫ বছর বয়সী একজন পুরুষের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দৈনিক ০.৮৪ গ্রাম এবং একই বয়সী একজন নারীর প্রতি কেজি ওজনের জন্য ০.৭৫ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। অর্থাৎ ১০০ কেজি ওজনের একজন পুরুষের দৈনিক প্রায় ৮৪ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মাংস খেয়ে এই চাহিদা পূরণ করা সহজ নয়, কারণ মাংসের মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অংশ প্রোটিন। তাই অনেক ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজনীয় প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেন, প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট কখনোই স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যের বিকল্প নয়। সুষম খাদ্যের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তাই নিজের শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসকের পরামর্শ বিবেচনা করে প্রোটিন নির্বাচন করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।