অস্ট্রেলিয়া

চেকআউট কর্মী থেকে ভিক্টোরিয়ার ৫০তম প্রিমিয়ার: বেন ক্যারলের রাজনৈতিক উত্থানের গল্প

  • 1:47 am - July 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩ বার
বেন ক্যারলের রাজনৈতিক উত্থানের গল্প। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই:  অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের নতুন প্রিমিয়ার হিসেবে শপথ নিয়েছেন বেন ক্যারল। জাসিন্টা অ্যালানের পদত্যাগের পর তিনি লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করে রাজ্যের ৫০তম প্রিমিয়ার হিসেবে দায়িত্ব নেন।

মেলবোর্নের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এয়ারপোর্ট ওয়েস্ট উপশহর, যা জনপ্রিয় চলচ্চিত্র দ্য ক্যাসল-এর কাল্পনিক চরিত্র ড্যারিল কেরিগানের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়, সেই এলাকাই গড়ে তুলেছে বেন ক্যারলের রাজনৈতিক জীবন।

১৯৭৪ সালে ক্যারলের বাবা-মা ওই এলাকায় নিজেদের বাড়ি নির্মাণ করেন। তার এক বছর পর জন্ম নেন বেন ক্যারল এবং আরও দুই বছর পর গঠিত হয় নিড্রি (Niddrie) নির্বাচনী এলাকা, যেখান থেকে পরে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বর্তমানে ৫১ বছর বয়সী বেন ক্যারল পেশায় একজন সাবেক আইনজীবী ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা। জাসিন্টা অ্যালানের পদত্যাগের পর দলীয় বৈঠকে নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তিনি লেবার পার্টির নেতৃত্ব পান এবং পরে ভিক্টোরিয়ার নতুন প্রিমিয়ার হিসেবে শপথ নেন।

পারিবারিক ব্যবসা থেকে রাজনীতির পথে

সংসদে ২০১২ সালে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণে বেন ক্যারল বলেছিলেন, তার বাবা-মা শুধু নিজেদের বাড়িই নির্মাণ করেননি, একই সঙ্গে “জিবিকে ইলেকট্রিকস” নামে একটি ছোট পারিবারিক ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানের নামের “জিবিকে” এসেছে পরিবারের সদস্য গ্রেগ, বেন ও কে-র নামের আদ্যক্ষর থেকে।

তিনি বলেন, পরিবার গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে একটি ছোট ব্যবসা পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। তবে তার বাবা-মা দুটি ক্ষেত্রেই সফল হয়েছিলেন।

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, রাতের খাবারের সময় যেন পরিবার একসঙ্গে নিশ্চিন্তে খেতে পারে, সে জন্য তার বাবা ফোনের রিসিভার খুলে রাখতেন, যাতে কোনো ফোনকল বিরক্ত করতে না পারে।

ক্যাশ কাউন্টার থেকে আইন পড়া

১৯৯৭ সালে দ্য ক্যাসল সিনেমাটি মুক্তির সময় বেন ক্যারল লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করতেন এয়ারপোর্ট ওয়েস্টের কেমার্ট সুপারস্টোরে ক্যাশিয়ার হিসেবে।

তিনি জানান, আট বছর কেমার্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আর্থিকভাবে অনেক সহায়তা করেছে।

একই সময়ে তিনি খুচরা বিক্রয় খাতের শ্রমিক সংগঠন শপ, ডিস্ট্রিবিউটিভ অ্যান্ড অ্যালাইড এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন (এসডিএ)-এ যোগ দেন। সেখান থেকেই শ্রমিক ইউনিয়নের ভূমিকা এবং কর্মজীবী মানুষের অধিকার সম্পর্কে তার গভীর ধারণা তৈরি হয়।

শ্রমিক সংগঠন থেকে রাজনৈতিক উপদেষ্টা

ইউনিয়নের অভিজ্ঞতাই তাকে রাজনীতিতে আসতে অনুপ্রাণিত করে। পরে তিনি ভিক্টোরিয়ার সাবেক লেবার প্রিমিয়ার স্টিভ ব্র্যাকসের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন।

স্টিভ ব্র্যাকস এবং তার উত্তরসূরি জন ব্রামবি, দুজনই পরবর্তীতে বেন ক্যারলের প্রশংসা করেছেন।

ছবি: সংগৃহীত

লেখক ও ভাষণ রচয়িতা জোয়েল ডিনের মতে, বেন ক্যারলের নেতৃত্বের ধরন ড্যানিয়েল অ্যান্ড্রুজ ও জাসিন্টা অ্যালানের ধারাবাহিকতার চেয়ে বরং স্টিভ ব্র্যাকস ও জন ব্রামবির সময়কার রাজনীতির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

জোয়েল ডিন বলেন, সামাজিকভাবে প্রগতিশীল এবং আর্থিকভাবে সংযত নীতির প্রতি বেন ক্যারলের ঝোঁক রয়েছে। তার মধ্যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তববাদী নেতৃত্বের সমন্বয় দেখা যায়।

তার মতে, অনেক রাজনীতিকের ক্ষেত্রে বোঝা যায় না তারা কী বিশ্বাস করেন। কিন্তু বেন ক্যারলের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন।

ফেডারেল রাজনীতির অভিজ্ঞতা

জোয়েল ডিন আরও বলেন, ফেডারেল রাজনীতিবিদ বিল শর্টেন ও স্টিফেন কনরয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও বেন ক্যারলের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে।

তার মতে, ড্যানিয়েল অ্যান্ড্রুজ ছিলেন অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া একজন নেতা। অন্যদিকে স্টিভ ব্র্যাকস ছিলেন পরামর্শভিত্তিক নেতৃত্বের প্রবক্তা। বেন ক্যারলও অনেকটা সেই ধারা অনুসরণ করেন।

সংসদে প্রবেশ

২০১২ সালে নিড্রি আসনের উপনির্বাচনে লেবার পার্টির মনোনয়ন পান বেন ক্যারল। ওই মনোনয়নের লড়াইয়ে তিনি বর্তমান ভিক্টোরিয়ান কোষাধ্যক্ষ জ্যাকলিন সাইমসকে পরাজিত করেন।

সাবেক উপপ্রিমিয়ার রব হালসের পদত্যাগে সৃষ্ট উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমবার ভিক্টোরিয়ার পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন।

একের পর এক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব

মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক জারেহ গাজারিয়ান বলেন, ২০১৪ সালে লেবার সরকার ক্ষমতায় ফেরার পর বেন ক্যারল এক ডজনেরও বেশি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৩ সালে তিনি জাসিন্টা অ্যালানের অধীনে উপপ্রিমিয়ার হন। তবে তার আগে নিজেও প্রিমিয়ার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যা তৎকালীন প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল অ্যান্ড্রুজকে ক্ষুব্ধ করেছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল।

গাজারিয়ানের মতে, ড্যানিয়েল অ্যান্ড্রুজ চেয়েছিলেন জাসিন্টা অ্যালান প্রিমিয়ার এবং টিম প্যালাস উপপ্রিমিয়ার হোন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেন ক্যারল উপপ্রিমিয়ারের পদ নিশ্চিত করেন এবং ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।

তিনি বলেন, অ্যান্ড্রুজ থেকে অ্যালানের নেতৃত্ব পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে মসৃণ হলেও এবার লেবার পার্টিকে নেতৃত্ব পরিবর্তনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চ্যালেঞ্জ

শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে বেন ক্যারলকে বেশ কিছু কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এর মধ্যে ভুলবশত দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার ফল আগেভাগে প্রকাশ হয়ে যাওয়া এবং শিক্ষকদের বেতন নিয়ে চলমান বিরোধের কারণে দুই দফা রাজ্যজুড়ে ধর্মঘট উল্লেখযোগ্য।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

অধ্যাপক জারেহ গাজারিয়ানের মতে, আগামী নির্বাচনের আগে নতুন প্রিমিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

নিজেও সম্প্রতি বেন ক্যারল বলেছেন, ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও লেবারকে নতুন উদ্যম নিয়ে জনগণের কাছে যেতে হবে।

তার ভাষায়, “আমাদের মূল বিষয়গুলোর ওপর জোর দিতে হবে। কমিউনিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হবে এবং ব্যবসার জন্য ভিক্টোরিয়াকে আরও উন্মুক্ত রাজ্যে পরিণত করতে হবে।”

জোয়েল ডিনের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির এই সময়ে বেন ক্যারলের উপশহরভিত্তিক রাজনৈতিক পরিচয় লেবার পার্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।

তার মতে, আগে ভিক্টোরিয়ার রাজনীতি মূলত মেলবোর্নের পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে পরিচালিত হতো। স্টিভ ব্র্যাকস ও জন ব্রামবি সেই ধারা বদলে আঞ্চলিক এলাকায় লেবারের অবস্থান শক্তিশালী করেন। পরে ড্যানিয়েল অ্যান্ড্রুজ নজর দেন মেলবোর্নের বাইরের উপশহরগুলোতে।

বেন ক্যারল যেসব উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপশহরের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে লেবারের শক্ত ঘাঁটি হলেও বর্তমানে স্বাধীন ও ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার এলাকায় পরিণত হয়েছে।

ইতিহাস কি পুনরাবৃত্তি হবে?

ভিক্টোরিয়ার ইতিহাসে নির্বাচনের এক বছরেরও কম সময় আগে নতুন প্রিমিয়ার নিয়োগের নজির খুব কম।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ১৯৮১ সালের লিন্ডসে থম্পসন। তিনিও শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং নির্বাচনের আগে প্রিমিয়ার হন। কিন্তু মাত্র ৩০৭ দিন দায়িত্ব পালন করে ১৯৮২ সালের নির্বাচনে জন কেইনের কাছে পরাজিত হন।

অধ্যাপক জারেহ গাজারিয়ান বলেন, নির্বাচনের বছরে নেতৃত্ব পরিবর্তন অনেক সময় সফল হয়, আবার অনেক সময় ব্যর্থও হয়। ভিক্টোরিয়ায় লিন্ডসে থম্পসনের অভিজ্ঞতা তারই একটি উদাহরণ।

সুত্রঃ এবিসি নিউজ

এই শাখার আরও খবর

লখনউয়ে ৭ তলা থেকে পড়ে বিজেপি নেতার রহস্যজনক মৃত্যু

মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই: ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনউয়ে একটি বহুতল ভবনের সপ্তম তলা থেকে পড়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতা ও উত্তর প্রদেশ সরকারের…

হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রায় হামলার অভিযোগ, সাংবাদিকদের গাড়ি ভাঙচুর

মেলবোর্ন, ২৯ জুলাই: হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রায় হামলার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। হামলায় এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের…

জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্প, শপিং মলের একাংশ ধস; বহু মানুষ আটকা

মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই: জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে একটি বহুতল শপিং মলের একাংশ ধসে পড়েছে। এতে মলটির ভেতরে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহু…

অর্থপাচারের মামলায় গ্রেপ্তার ৮১ ফুট রাম মূর্তি নির্মাণের উদ্যোক্তা হরিদাস

মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই: গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ৮১ ফুট উচ্চতার ভগবান রামের মূর্তি নির্মাণের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।গত…

প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের পর শিক্ষাবিভাগের অবস্থান বদল, তদন্ত থেকে সরে এল কর্তৃপক্ষ

মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই: সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি পালের ফেসবুকে পোস্ট করা একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া…

নেত্রকোনায় ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে হিন্দু বাড়িতে হামলা- সর্বশেষ কি জানা যাচ্ছে

মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই: বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা যেন বারবার ফিরে আসছে। সর্বশেষ নেত্রকোনার কলমাকান্দা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au