বুধবার সন্ধ্যায় দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের সংবাদ সম্মেলন।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট: বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের বহু নেতা ও নেতাকর্মী ভারতে চলে যান। তাদের অনেকে প্রায় দুই বছর ধরে ভারতেই অবস্থান করছেন। তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর ভারতে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীও বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। এমন তথ্য উঠে এসেছে বিবিসি বাংলা-র এক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ৭০ জন নেতা পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতা ও এর আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর বিভিন্ন সময়ে তারা ভারতে যান।
শুধু শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাই নন, মধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীও ভারতের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে কলকাতা, শিলিগুড়ি ও ত্রিপুরায় থাকা নেতাকর্মীর সংখ্যা একসময় হাজারের বেশি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পদমর্যাদার প্রায় ৪০ জন পুলিশ কর্মকর্তার ভারতে অবস্থানের তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, এক পর্যায়ে সাবেক সংসদ সদস্য, সহযোগী সংগঠনের নেতা, জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মী, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাসহ প্রায় ২০০ জন কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন বলে আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ভারতে অবস্থানরত নেতাদের কয়েকজন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তারা দেশের বাইরে থেকেও দলের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা এবং দেশে থাকা কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় নতুন প্রস্তুতি
বুধবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এর আগেও একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দেশে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যের পর ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, তারাও দেশে ফেরার বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা বলছেন, দেশে ফিরে যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যিনি বাংলাদেশের একটি আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে রয়েছেন, বিবিসি বাংলাকে বলেন, শেখ হাসিনার ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনিও দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। তার দাবি, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং দেশে ফিরে তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চান।

বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও দেশে ফেরার বিষয়ে মানসিক ও পারিবারিক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশে ফিরলে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন, সে বিষয়ে তাদের ধারণা রয়েছে।
ভারতে জীবনযাপনেও এসেছে পরিবর্তন
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে থাকা আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বর্তমানে ভাড়া বাসায় থাকছেন। তাদের অনেকের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা নেই। আবার কয়েকজন মিলে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার ঘটনাও রয়েছে।
ভারতে যাওয়ার পর আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে অনেকের জীবন চলছে বলে তারা জানিয়েছেন। বাংলাদেশে থাকার সময় যে ধরনের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল, তাদের অনেকেরই এখন তা নেই। ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে ট্যাক্সি বা গণপরিবহন ব্যবহার করছেন বলেও কয়েকজন জানিয়েছেন।
সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ জানান, ভারতে যাওয়ার পর শুরুতে তাকে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসায় থাকতে হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে নিজের ফোন ব্যবহার না করে অন্যের ফোনের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলেও তিনি জানান।
অভিনেত্রী ও আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত রোকেয়া প্রাচী জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর প্রায় দেড় বছর তিনি বাংলাদেশেই নিজের অবস্থান গোপন রেখে ছিলেন। এ সময় নিরাপত্তার কারণে একাধিকবার জায়গা পরিবর্তন এবং সিম পরিবর্তন করতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পরে তিনি ভারতেও চলে যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি সক্রিয়তা
ভারতে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, গত দুই বছরে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক ছিল। ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের পাশাপাশি বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মী এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় অবস্থানরত নেতারা নিজেদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠকও করেছেন। একসময় কলকাতার কাছাকাছি একটি বাণিজ্যিক অফিস ভাড়া নিয়ে সেখানে বৈঠক করা হতো। দলীয়ভাবে ওই স্থানকে ‘পার্টি অফিস’ বলা হলেও পরে সেটি আর ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে আওয়ামী লীগের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।
শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের দাবি
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার যোগাযোগও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। প্রথম দিকে সরাসরি দেখা করার তথ্য না থাকলেও পরবর্তী সময়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ছোট ছোট দলে দিল্লিতে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন বলে জানা গেছে।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী জানিয়েছেন, গত দুই বছরে দেশের বাইরে থাকা নেতারা দলকে সংগঠিত রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।
ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, বিভিন্ন কমিটি পুনর্গঠন, চলমান মামলায় সহযোগিতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর মতো কাজগুলো তারা করে যাচ্ছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দলের নেতাকর্মীরা দেশে ফেরার জন্য মানসিক ও পারিবারিকভাবে প্রস্তুত। তবে কবে এবং কীভাবে তারা ফিরবেন, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হয়নি।
এদিকে শেখ হাসিনাও দেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করলেও ঠিক কবে, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো ঘোষণা দেননি। ফলে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎ অবস্থান এবং দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।