মানবিক বিভাগে ১০০ ছাত্রের ৫৯ জনই ফেল
মেলবোর্ন, ১০ আগষ্ট: চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে মানবিক বিভাগে ছাত্রদের ফলাফলে বড় ধরনের অবনমন দেখা গেছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা…
মেলবোর্ন, ১০ আগষ্ট: একসময় বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অন্যতম প্রধান অর্থায়নকারী ছিল চীন। পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোসহ একাধিক মেগা প্রকল্পে বেইজিংয়ের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পেয়েছে ঢাকা। তবে গত কয়েক বছরে সেই ধারায় স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। নতুন বড় প্রকল্পে চীনের ঋণ প্রতিশ্রুতি প্রায় থেমে গেছে। পাশাপাশি দেশটিতে চীনা বেসরকারি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনার অর্থায়ন নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), কূটনৈতিক সূত্র, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, কোভিড-পরবর্তী সময়ে চীনের অর্থনৈতিক চাপ এবং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, সব মিলিয়ে ঢাকা-বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশকে ঋণ ও অনুদান হিসেবে চীন ১ হাজার ১০৪ কোটি ডলারের আর্থিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বিপরীতে ছাড় হয়েছে প্রায় ৭৭২ কোটি ডলার। এর বড় অংশ এসেছে ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের পর থেকে ২০২১ সালের মধ্যে।
২০১৬ সালে শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় ২৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও সামনে আসে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব প্রকল্পের খুব অল্প কয়েকটির ক্ষেত্রে ঋণচুক্তি হয়েছে।
২০২১ সালে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে প্রায় ১১৩ কোটি ডলারের ঋণচুক্তির পর বড় কোনো নতুন প্রকল্পে চীন উল্লেখযোগ্য অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ২০২৩ সালে রাজশাহী ওয়াসার ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্পে প্রায় ২৮ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি ছিল সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য চীনা সহায়তার একটি।
চীনের আগ্রহ কমে যাওয়ার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। একসময় চীন নিজ উদ্যোগে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ প্রকল্পটির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছিল।
এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চিঠি চালাচালি হয় এবং চুক্তির খসড়া তৈরির পর্যায়েও আলোচনা এগিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরকে কেন্দ্র করে তিস্তা প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হলেও সফরে এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী জানিয়েছেন, আগের ঋণ প্রস্তাব নিয়ে এবার আলোচনা হয়নি। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু হচ্ছে। ফলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় আরও কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ঋণ কমে যাওয়ার পেছনে শুধু রাজনৈতিক কারণ নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক ধীরগতি এবং অর্থছাড়ে জটিলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের বেশ কিছু প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের আগে ঝুঁকি নিয়ে আরও সতর্কভাবে মূল্যায়ন করছে বেইজিং।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ছিল চীন। এরপর করোনা মহামারির কারণে চীনা বিনিয়োগে ভাটা পড়ে। বর্তমানে চীনের বড় বিনিয়োগের একটি অংশ আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বা আরসিইপি সদস্য দেশগুলোর দিকে যাচ্ছে।
তার মতে, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ করতে পারলে এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে আরও যুক্ত হতে পারলে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা।
কুমিল্লা ইপিজেডে প্লট নেওয়া কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশে একটি চীনা বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, চীনে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের শোরুম চালু এবং বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, চীনা ঋণ নিয়ে বাংলাদেশে যে ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের ১০ শতাংশেরও কম চীন থেকে এসেছে, যা জাপানের ঋণের কাছাকাছি। তবে চীনা ঋণ নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি আলোচনা ও সমালোচনা হয়।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই চীনের ঋণকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করা হয়। একই সময়ে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতাও রয়েছে, যদিও তা নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিয়ে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোতেও চীনা বিনিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে চীনের নিজস্ব অর্থনীতিও নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে বেইজিংও বিদেশে নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সতর্কতা দেখাচ্ছে।
চীনের ঋণ প্রতিশ্রুতি কমে গেলেও বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি এখনো শক্তিশালী। পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণ, নদীশাসন, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেলসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনা প্রতিষ্ঠান বড় ভূমিকা রেখেছে।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ২৪০টি চীনা কোম্পানি বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্যেও দেখা যায়, ঋণের তুলনায় বাংলাদেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ আরও বড়।
ফলে চীনের ঋণপ্রবাহে ভাটা এলেও বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি কমে যাচ্ছে, এমনটা বলার সুযোগ নেই। বরং বড় প্রকল্পে সরাসরি ঋণ সহায়তার পরিবর্তে বিনিয়োগ, ঠিকাদারি কাজ, বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে সম্পর্কটি ধীরে ধীরে নতুন রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au