বাংলাদেশ

এক্সক্লুসিভ

বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের ঐক্যে ফাটল, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট নিয়ে প্রশ্ন

  • 1:13 pm - August 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২ বার
বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো।ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট: বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনের আগে যে ঐক্যের চিত্র তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস পর তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটের একাধিক শরিক দল নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়ায় জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে হেফাজতে ইসলাম কওমিভিত্তিক ইসলামি দলগুলোকে নিয়ে আলাদা ঐক্যের উদ্যোগ জোরদার করায় ইসলামপন্থী রাজনীতিতে একাধিক প্রভাবকেন্দ্র তৈরি হওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আসন ভাগাভাগি, নির্বাচনের পর জোটের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব নিয়ে অসন্তোষের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং খেলাফত মজলিসের মতো দলগুলো জোটের কার্যক্রম থেকে সরে গেছে বা নিজেদের দূরত্ব তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম ও হিজবুত তাওহিদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ এবং রাজপথের কর্মসূচি ইসলামপন্থী রাজনীতির ভেতরের প্রতিযোগিতাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

ফলে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক পরিসর এখন আগের তুলনায় বেশি খণ্ডিত হয়ে পড়ছে। বৃহত্তর একটি ইসলামপন্থী জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভবিষ্যতের স্থানীয় সরকার কিংবা জাতীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে হিজবুত তাওহিদের বিক্ষোভ

২০২৬ সালের ২ আগস্ট হিজবুত তাওহিদের ঢাকা মহানগর ইউনিট ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে। নোয়াখালী জেলায় হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে দেওয়া বক্তব্য, হুমকি, প্রচারণা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

এর এক দিন আগে, ১ আগস্ট নোয়াখালী জিলা স্কুল মাঠে হেফাজতে ইসলামের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেই সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদে ২ আগস্ট সকাল ১১টায় হিজবুত তাওহিদ মানববন্ধন শুরু করে।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেওয়ার সময় হিজবুত তাওহিদের ঢাকা মহানগর সভাপতি মাহবুব আলম মাহফুজ অভিযোগ করেন, হেফাজতে ইসলামের ওই সমাবেশ ছিল উগ্র ও উসকানিমূলক। তার দাবি, এ ধরনের বক্তব্য নোয়াখালীর শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে।

মাহফুজ আরও অভিযোগ করেন, হেফাজতে ইসলামের নেতারা হিজবুত তাওহিদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন এবং তাদের কবর দেওয়া, উচ্ছেদ করা ও বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করার মতো হুমকি দিয়েছেন।

তার আরও অভিযোগ, হেফাজতে ইসলামের কয়েকজন বক্তা নারীবিদ্বেষী ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দিয়েছেন।

খেলাফত মজলিসের ১১ দলীয় ঐক্য থেকে সরে দাঁড়ানো

ইসলামপন্থী জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে ২০২৬ সালের ২৫ জুলাই। ওই দিন খেলাফত মজলিস ১১ দলীয় ঐক্য কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয় এবং জানায়, ভবিষ্যতে তারা নিজেদের কর্মসূচি এককভাবে পালন করবে।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের পর খেলাফত মজলিস হলো দ্বিতীয় দল, যারা ১১ দলীয় ঐক্য কর্মসূচি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিল।

ঢাকার কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দলটির ঘোষণায় বলা হয়, ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য মূলত একটি নির্বাচনী সমঝোতা ছিল। জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই সমঝোতার কার্যকারিতাও শেষ হয়েছে। যদিও নির্বাচনের পর খেলাফত মজলিস ১১ দলীয় জোটের কয়েকটি কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছিল।

দলটি জানিয়েছে, দেশ, জাতি ও ইসলামের প্রয়োজনে ভবিষ্যতে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের প্রয়োজন হলে সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন বলেও জানানো হয়েছে।

একের পর এক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে

২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১১ দলীয় জোটের ভেতরে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঘটনা একদিনে শুরু হয়নি।

১৬ জানুয়ারি ২০২৬, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে সরে দাঁড়ায়। দলটি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ঠিক এক দিন আগে, ১৫ জানুয়ারি, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট আসন ভাগাভাগির ঘোষণা দিয়েছিল।

এরপর ৬ জুন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন প্রকাশ্যে জানায়, তারা আর ১১ দলীয় জোটের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নিজেদের বিবেচনা করছে না।

১৩ জুন চট্টগ্রামে ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশের পর খেলাফত মজলিস জোটকে অনুরোধ করে, ভবিষ্যতের কর্মসূচিতে তাদের দল ও নেতাদের নাম ব্যানার এবং প্রচারসামগ্রীতে ব্যবহার না করতে।

শেষ পর্যন্ত ২৫ জুলাই খেলাফত মজলিস আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ দলীয় ঐক্য থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়।

যেভাবে গড়ে উঠেছিল ১১ দলীয় জোট

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর। ওই সময় জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি সমমনা রাজনৈতিক দল নিয়ে জোটটি গঠিত হয়।

প্রাথমিকভাবে জোটে ছিল জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি বা জাগপা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।

এরপর ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ অলী আহমেদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি জোটে যোগ দেয়। এতে দলসংখ্যা বেড়ে ১০ হয়।

পরদিন ২৯ ডিসেম্বর আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টিও জোটে যোগ দিলে এটি ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটে পরিণত হয়।

তবে নির্বাচনের আগেই জোটে প্রথম বড় ধরনের বিভাজন দেখা দেয়। ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে যায় এবং এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এরপর ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ লেবার পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়। ফলে জোট আবার ১১ দলের কাঠামোয় ফিরে আসে।

নির্বাচনের পর জোটে দুর্বলতার লক্ষণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যেই জোটের ভেতরের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন জোটের বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয় এবং তাদের নাম ভবিষ্যতের কর্মসূচিতে ব্যবহার না করার অনুরোধ জানায়। যদিও দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ২৫ জুলাই। খেলাফত মজলিস জোটের সব ধরনের কার্যক্রম ও কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির যুক্তি ছিল, জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে নির্বাচনী জোটের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে।

এর ফলে কার্যত জোটের সক্রিয় শরিক দলের সংখ্যা ১০-এ নেমে আসে। তবে জামায়াতে ইসলামী এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আজাদ দাবি করেছেন, জোটের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই এবং জোট ভবিষ্যতেও থাকবে।

তিনি বলেন, সব দল সব সময় প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে না। খেলাফত মজলিস এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন জোট ছাড়ার কথা বলেনি, তারা শুধু আপাতত কিছু কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছে না।

তবে একের পর এক দল নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে মূলত নির্বাচনী সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই জোট নির্বাচনের পর কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আসন ভাগাভাগি নিয়ে শরিক দলের অসন্তোষ

জোটের ভেতরের অসন্তোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি।

২৭ জুন ২০২৬ ময়মনসিংহ বিভাগীয় সমাবেশের দিন খেলাফত মজলিস রংপুর মহানগর সভাপতি তৌহিদুর রহমান মণ্ডল রাজু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জোটের রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন।

তিনি লিখেছেন, নির্বাচনের আগে জোটের শরিকদের মধ্যে আসন ও নির্বাচনী সুবিধা ভাগাভাগি নিয়ে যে সমঝোতা হয়েছিল, নির্বাচনের পর তার মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন ছিল।

তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি সংসদীয় আসনে, জাতীয় নাগরিক পার্টি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয় পেয়েছে। অন্য শরিক দলগুলো কোনো সংসদীয় আসনে জয় পায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামী ১১টি সিটি করপোরেশনের জন্য নিজেদের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। একই সময়ে জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় বিভিন্ন সংকট মোকাবিলার কথা বললেও জামায়াতে ইসলামী নিজেদের নির্বাচনী প্রস্তুতিও এগিয়ে নিচ্ছে।

তার ভাষায়, অন্য শরিক দলগুলো অনেকটা দর্শকের ভূমিকায় চলে গেছে।

খেলাফত মজলিস জোট থেকে সরে দাঁড়ালেও ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভবিষ্যতে সহযোগিতার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি। তবে তাদের সিদ্ধান্ত জোটের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি সামনে এনেছে।

একদিকে যখন ১১ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম কওমিভিত্তিক ইসলামি দলগুলোকে নিয়ে আলাদা ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার করেছে।

১৬ জুলাই ২০২৬ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের প্রধান আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে কওমি ধারার সাতটি ইসলামি দল ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

এই সাত দলের মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের নেতৃত্বে রয়েছেন আবদুল বাসিত আজাদ এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন হাবিবুল্লাহ মিয়াজি। এসব দলের কয়েকটি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

তবে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক পুরোপুরি সমন্বিত নয়। বরং বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে হেফাজতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য সমালোচনা এসেছে।

জামায়াতের বিরুদ্ধে হেফাজতের কঠোর অবস্থান

৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হেফাজতে ইসলামের প্রধান আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে কঠোর বক্তব্য দেন।

তিনি মুসলমানদের জামায়াতে ইসলামীকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান এবং দাবি করেন, জামায়াতকে ভোট দেওয়া অনুমোদিত নয়।

তিনি আরও বলেন, মওদুদীর চিন্তাধারার জামায়াতকে সামনে রেখে তারা একটি ‘জিহাদ’ চালাচ্ছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে ইসলামের এবং ঈমানের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ওই সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীকে একটি ‘রক্তপাতকারী গোষ্ঠী’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

এই বক্তব্যগুলোই দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির ভেতরে আদর্শগত ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য কতটা গভীর।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বের দাবি কতটা টেকসই

সাম্প্রতিক বিভাজনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব হলো, একটি ঐক্যবদ্ধ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব দেওয়ার জামায়াতে ইসলামীর দাবিটি এখন আগের তুলনায় বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

১১ দলীয় জোট গঠনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইসলামপন্থী দলগুলোকে এক জায়গায় আনা, নির্বাচনী বিভাজন কমানো, ভোটের শক্তিকে একত্র করা এবং দলগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমিয়ে নির্বাচনে যৌথ সুবিধা তৈরি করা।

কিন্তু একাধিক শরিক দল জোটের কার্যক্রম থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়ায় এই জোট এখন বাংলাদেশের পুরো ইসলামপন্থী রাজনৈতিক পরিসরের প্রতিনিধিত্ব করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হলেও সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে। এসব নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে নতুন করে প্রতিযোগিতা দেখা দিতে পারে। একক রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, ভোটব্যাংক ও প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা জোরদার হতে পারে।

বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসা নেটওয়ার্কের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

জামায়াতে ইসলামী দেশের অন্যতম শক্তিশালী নির্বাচনী ইসলামপন্থী দল এবং তাদের বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তবে দেশের বিস্তৃত কওমি মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক এবং ধর্মীয় আলেমদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে সংগঠনটির সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব ব্যাপক।

এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলাম সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থেকেও ধর্মীয় বক্তব্য, সামাজিক আলোচনা এবং রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের মধ্যে দীর্ঘদিনের আদর্শগত পার্থক্যও ইসলামপন্থী ঐক্যের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

জামায়াতে ইসলামী সৈয়দ আবুল আ’লা মওদুদীর রাজনৈতিক চিন্তাধারার ওপর গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামী চিন্তাধারাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই পার্থক্য দুই পক্ষের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দূরত্ব তৈরি করেছে।

ধর্মীয় প্রভাব ও নেতৃত্ব নিয়েও বাড়ছে প্রতিযোগিতা

হিজবুত তাওহিদ ও হেফাজতে ইসলামের সাম্প্রতিক বিরোধ দেখিয়ে দিচ্ছে, ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর প্রতিযোগিতা এখন শুধু নির্বাচন বা সংসদীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই।

ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামাজিক প্রভাব, জনসমর্থন এবং ধর্মীয় বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।

ফলে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতি ক্রমেই একাধিক প্রভাবকেন্দ্রে বিভক্ত হচ্ছে। একদিকে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম কওমি মাদ্রাসা ও আলেমদের নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে আলাদা প্রভাব বলয় ধরে রাখছে। পাশাপাশি অন্যান্য ইসলামপন্থী দলও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে যে নির্বাচনী ঐক্য বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছিল, নির্বাচনের পর সেটি নানা দলীয় স্বার্থ, আসন ভাগাভাগি নিয়ে অসন্তোষ, আদর্শগত পার্থক্য এবং নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার কারণে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আগামী দিনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কিংবা জাতীয় রাজনীতিতে এই বিভাজনের প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট যদি শরিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ধরে রাখতে না পারে, তাহলে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে একক নেতৃত্বের পরিবর্তে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবকেন্দ্রের বিকাশ আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

সুত্রঃ Eurasia Review

এই শাখার আরও খবর

ডিআর কঙ্গোতে ইবোলায় মৃতের সংখ্যা ২০০০ ছাড়াল

মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট: গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা ভাইরাসের বর্তমান প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত ২ হাজার…

যুক্তরাষ্ট্রে গৌতম আদানির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা খারিজ, বন্ধ হলো ঘুষ-প্রতারণার বিচার

মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট:  ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান ফৌজদারি মামলা শেষ পর্যন্ত খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। মার্কিন বিচার বিভাগ তার…

বাড়ির দাম কমার স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে সুদের হার, অস্ট্রেলিয়ায় ক্রেতারা বিপাকে

মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট: অস্ট্রেলিয়ায় গড় বেতন পাওয়া দুই সদস্যের একটি দম্পতির বাড়ি কেনার জন্য ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা চার দফা সুদের হার বৃদ্ধির পর আনুমানিক ৯২ হাজার…

শেকড়ের বাংলাদেশ: সংস্কৃতি বাঁচলে জাতি বাঁচে

মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট: একটা জাতিকে বোমা মেরে শেষ করা যায়। ট্যাংক দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর একটা মৃত্যু আছে-সেটা হলো সংস্কৃতির মৃত্যু। সংস্কৃতি…

ইউটিউব থেকে আয় করতে আসছে নতুন নিয়ম

মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট: ইউটিউব থেকে বিজ্ঞাপন ও ইউটিউব প্রিমিয়ামের মাধ্যমে আয় করতে নির্মাতাদের জন্য নতুন নিয়ম চালু করতে যাচ্ছে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব। আগামী বছরের…

রাজনীতি নিষিদ্ধের পরও বেরোবিতে রাজনৈতিক সহিংসতা, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব ধরনের দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত থাকলেও ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রকাশ্য তৎপরতা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au