মেলবোর্ন, ১৪ আগষ্ট: বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু তারিখ গৌরবের, কিছু তারিখ বেদনার। আবার কিছু তারিখ এমন, যা একটি জাতির বিবেককে অনন্তকাল প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে রাখে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তেমনই একটি দিন—বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার, মর্মান্তিক ও কলঙ্কিত অধ্যায়।
সেদিন ভোররাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাসভবনে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যে মানুষটি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির সংগ্রামে উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁকেই স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল।
এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ককে হত্যার ঘটনা বললে ভুল হবে। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথকে সহিংসভাবে বদলে দেওয়ার প্রয়াস; মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচেতনা এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের ওপর এক গভীর আঘাত।
ঘাতকদের নিষ্ঠুরতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাদের বুলেট থেকে রক্ষা পাননি তাঁর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, দ্বিতীয় পুত্র সেনা কর্মকর্তা শেখ জামাল এবং মাত্র ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল।
নিহত হন শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল খুকী, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসেরসহ পরিবারের আরও অনেকে। একই রাতে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণির বাসভবনেও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। প্রাণ হারান নারী, শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ বহু মানুষ।
একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নিজ বাসভবনে হত্যা করার এমন নির্মমতা পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল। বিশেষ করে শিশু শেখ রাসেলের হত্যা প্রমাণ করে, ঘাতকদের উদ্দেশ্য শুধু ক্ষমতা দখল ছিল না; তারা একটি পরিবারের উত্তরাধিকার এবং একটি জাতির আবেগকেও নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল।
বিদেশে অবস্থান করায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু তাঁদের জীবনে নেমে আসে এমন এক শোক, যার গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একটি রাতেই তাঁরা হারান বাবা-মা, ভাই, ভাবি এবং পরিবারের প্রায় সব ঘনিষ্ঠজনকে।
টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে বাঙালির বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধুর জীবনকে শুধু ১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত পরিণতির মধ্য দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাঁর ঐতিহাসিক ব্যাপ্তিকে উপলব্ধি করা যাবে না। বুঝতে হবে, কেন তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল এবং কেন মৃত্যুর এত বছর পরও তাঁর নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে অমোচনীয়।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবন থেকেই সাধারণ মানুষের অধিকার, রাজনৈতিক ন্যায়বিচার এবং বাঙালির মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত হন। ভাষা আন্দোলন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিকাশ, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ঐতিহাসিক ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ রায়—প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি ধীরে ধীরে একটি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন।
বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁকে জীবনের দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু, নির্যাতন, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ কিংবা মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা—কোনো কিছুই তাঁকে জনগণের দাবি থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ একটি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করেছিল। তাঁর বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; সেটি ছিল বাঙালির শতবর্ষের বঞ্চনা ভেঙে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত আহ্বান।
২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তাঁর নামেই পরিচালিত হয় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ। তাঁর অনুপস্থিতিতে গঠিত মুজিবনগর সরকার তাঁকেই রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। লাখো মানুষের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য নারীর অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
তাই বঙ্গবন্ধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক সম্পদ নন। তিনি একটি দলের নেতা ছিলেন—কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত স্বাধীনতার সংগ্রাম সমগ্র বাংলাদেশের ইতিহাস। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হতে পারে, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতির সমালোচনা হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকা অস্বীকার করা ইতিহাসের প্রতি অসততা।
হত্যার পর বিচারহীনতার অন্ধকার
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল বিচারহীনতার আরেক কলঙ্কজনক অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের পথ বন্ধ করতে দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। ঘাতকদের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও বিদেশে কূটনৈতিক দায়িত্বও পেয়েছিল।
একটি রাষ্ট্র যখন হত্যাকারীদের বিচারের বদলে সুরক্ষা ও পুরস্কার দেয়, তখন অপরাধ শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও দায়মুক্তির এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৯৬ সালে দায়মুক্তির বিধান বাতিল হওয়ার পর প্রচলিত আইনে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে কয়েকজন দণ্ডিতের শাস্তি কার্যকর হয়েছে। তবে পলাতক দণ্ডিতদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার বিষয়টি এখনো জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে রয়ে গেছে।
এই বিচার কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রশ্ন ছিল না। একটি সভ্য রাষ্ট্রে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে—এটাই আইনের শাসনের স্বাভাবিক দাবি। কারণ হত্যাকারীর পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, অপরাধের বিচার না হলে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
শোককে দলীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না
দীর্ঘদিন ধরে ১৫ আগস্টের স্মরণ অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি স্থাপন, শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা কিংবা শোকের ব্যানার—এসব স্মরণচর্চার অংশ হতে পারে; কিন্তু এগুলোই বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার শেষ কথা নয়।
বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার অর্থ তাঁর নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করা নয়। তাঁর আদর্শের কথা বলে দুর্নীতি, বৈষম্য, নিপীড়ন বা ক্ষমতার অপব্যবহারকে আড়াল করাও তাঁর প্রতি সম্মান নয়। যে নেতা আজীবন শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারের জন্য লড়েছেন, তাঁকে সম্মান জানাতে হলে রাষ্ট্রকে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে অতিরঞ্জিত বন্দনা কিংবা প্রশ্নহীন আনুগত্যের মধ্যে বন্দি করাও সঠিক নয়। ইতিহাসের একজন মহান নেতাকে যথার্থভাবে জানতে হলে তাঁর সাফল্য, সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা এবং সময়ের বাস্তবতাকে দলিলের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করতে হবে। যুক্তিনির্ভর সমালোচনা ইতিহাসচর্চাকে সমৃদ্ধ করে; কিন্তু বিদ্বেষ থেকে তাঁর অবদান অস্বীকার কিংবা স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ইতিহাস ও স্মৃতিচিহ্ন রক্ষার দায়
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিচিহ্ন আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার জন্য গভীর উদ্বেগের। সবচেয়ে বেদনাদায়ক আঘাত এসেছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক বাড়িতে—যেটি শুধু একটি পরিবারের বাসভবন নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান সাক্ষ্য।
এই বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও রাষ্ট্র কর্তৃক বুল ডেজার চালিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ সাধনে কোনো রাজনৈতিক মতপার্থক্যের স্বাভাবিক প্রকাশ হতে পারে না। কোনো নেতা বা দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলে তার জবাব রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে দিতে হয়। ইতিহাসের দলিল, জাদুঘর কিংবা স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা ধ্বংস করে কোনো জাতি মহান হয় না।
একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করার অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা নয়। বরং এর অর্থ হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের সাক্ষ্য অক্ষত রাখা। বিশ্বের সভ্য দেশগুলো তাদের গৌরবের পাশাপাশি বেদনা, যুদ্ধ, গণহত্যা ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের স্মৃতিচিহ্নও সংরক্ষণ করে—যাতে মানুষ অতীতের ভুল সম্পর্কে জানতে এবং তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
ধানমন্ডি ৩২-এর ইট-পাথর ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব, কিন্তু সেখানে সংঘটিত ইতিহাস মুছে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং ধ্বংসস্তূপটি আমাদের রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং জাতীয় স্মৃতি রক্ষায় ব্যর্থতার সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।
১৫ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
১৫ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ঘৃণা, প্রতিহিংসা ও রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো জাতিকে স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ দিতে পারে না। যে রাজনীতি প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার বদলে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও মানবিক ভিত্তিকেই ধ্বংস করে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করতে হলে আমাদের সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নাগরিকের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে। শিশু শেখ রাসেলের হত্যায় শোক প্রকাশ করে অন্য কোনো শিশুর মৃত্যুতে নীরব থাকা যায় না। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বিচার দাবি করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ন্যায়বিচারের অধিকার অস্বীকার করাও চলে না।
ন্যায়বিচার নির্বাচিতভাবে প্রয়োগ করা হলে তা আর ন্যায়বিচার থাকে না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে হবে, যেখানে দল, ধর্ম, পরিচয় ও রাজনৈতিক মত নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক সমান আইনি সুরক্ষা পাবে।
আজ বাংলাদেশকে আত্মজিজ্ঞাসা করতে হবে—আমরা কি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বৈষম্যহীন, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পেরেছি? সাধারণ মানুষ কি ন্যায়বিচার পাচ্ছে? সংখ্যালঘুরা কি নিরাপদ? মানুষ কি নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারছে? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের জন্য কাজ করছে?
যদি এসব প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক না হয়, তবে শুধু ফুল, ব্যানার ও আনুষ্ঠানিক শোক বঙ্গবন্ধুর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা হতে পারে না।
শোক থেকে শপথে
১৫ আগস্ট আমাদের কাঁদায়। বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত দেহ, বঙ্গমাতার শেষ মুহূর্ত, শেখ কামাল ও শেখ জামালের অসমাপ্ত জীবন এবং ছোট্ট শেখ রাসেলের করুণ মৃত্যু—সবকিছু বাঙালির হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।
কিন্তু এই কান্না শুধু আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শোককে শক্তিতে, স্মৃতিকে দায়িত্বে এবং ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের শিক্ষায় রূপান্তর করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুকে প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে বাংলাদেশকে এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে, যেখানে আর কোনো ১৫ আগস্ট ফিরে আসবে না; রাজনৈতিক বিরোধের কারণে কাউকে হত্যা করা হবে না; কোনো হত্যাকারী দায়মুক্তি পাবে না; কোনো শিশুকে তার পরিচয়ের জন্য প্রাণ দিতে হবে না এবং ক্ষমতার পরিবর্তনে জাতীয় ইতিহাস ভেঙে ফেলা হবে না।
ঘাতকের বুলেট বঙ্গবন্ধুর জীবন থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর নাম কিংবা বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মুছে দিতে পারেনি। কারণ বঙ্গবন্ধু শুধু ইতিহাসের একটি চরিত্র নন—তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রাম, বাঙালির আত্মপরিচয় এবং একটি রাষ্ট্রের জন্মকথার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজ শোকাবহ ১৫ আগস্টে তাই আমাদের উচ্চারণ হোক—
কাঁদো বাঙালি, কাঁদো—শুধু শোকে নয়, আত্মজিজ্ঞাসায় কাঁদো। সেই মানুষটির জন্য কাঁদো, যিনি একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বাঙালিকে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সাহস দিয়েছিলেন।
তারপর শপথ নাও—ইতিহাসকে রক্ষা করবে, হত্যার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করবে, ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াবে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ নির্মাণের সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে।
সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়, মেলবোর্ন