যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়া। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৪ আগষ্ট- যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার আসন্ন যৌথ সামরিক মহড়া ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে কোরীয় উপদ্বীপে। বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ শুরু হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, মহড়ার জবাবে তারা ‘নতুন মাত্রার প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে।
আগামী সোমবার থেকে শুরু হয়ে ১১ দিন চলবে ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়া। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনা ও অন্যান্য সামরিক সদস্য এবং দেশটিতে অবস্থানরত প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা অংশ নেবে।
উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েনের পর দেশটির সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মিত্র দুই দেশ উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার সেনাদের রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়টি এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে। এর ফলে কোরীয় উপদ্বীপের পাশাপাশি পুরো পূর্ব এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন।
উত্তর কোরিয়ার হুঁশিয়ারির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও এ অঞ্চলে তার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও সিউলের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়, যৌথ সামরিক মহড়া প্রতিরক্ষামূলক এবং সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানোর অংশ। তবে পিয়ংইয়ং এসব মহড়াকে উত্তর কোরিয়ায় আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করে।
ট্রাম্প প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা
এদিকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নানা ঘটনা সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট চলতি মাসের শেষ দিকে দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে হোয়াইট হাউসের অন্যতম আলোচিত এই পদে কে আসছেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
লেভিট সাংবাদিকদের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডার জন্য পরিচিত। সম্প্রতি তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কাজে ফিরেছেন। তার পদত্যাগের ঘোষণার পর এরই মধ্যে সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডে-লাইট সেভিংস টাইম’ বা ঘড়ির সময় পরিবর্তনের প্রথা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পক্ষেও চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, মানুষ বারবার ঘড়ির সময় পরিবর্তন করতে ‘বিরক্ত ও ক্লান্ত’। সন্ধ্যায় অতিরিক্ত এক ঘণ্টা আলো থাকলে অপরাধ, বিশেষ করে হত্যাকাণ্ড কমতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এ দাবির পক্ষে শক্তিশালী তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে।
কেনেডি সেন্টারে ট্রাম্পের নাম নিয়ে বিতর্ক
ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টার নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড ভবনের বাইরের অংশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম পুনরায় যুক্ত করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে একজন বিচারক নামটি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পরও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও চাপে পড়েছে। ইকোনমিস্ট/ইউগভ পরিচালিত এক জনমত জরিপে তার অনুমোদনের হার তার দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট পাওয়ার পর বর্তমানে প্রায় তিনজনের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিক তার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছেন।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব মার্কিন সামরিক বাহিনীতেও
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাব মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপরও পড়ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সামরিক সদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সময় জাহাজে আটকে থাকার কারণে তাদের মানসিক চাপ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধ পরিচালনার মধ্যে রণতরীটির বর্তমান মোতায়েনের সময়কাল আধুনিক যুগে কোনো মার্কিন জাহাজের সবচেয়ে দীর্ঘ মোতায়েনের সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারে
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও। শুক্রবার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। অপরদিকে তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে এবং মার্কিন ডলারের মূল্য কমেছে।
বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছেন। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক কম মূল্যস্ফীতির তথ্যের পর অনেকেই আশা করছেন, ফেডারেল রিজার্ভ দ্রুত সুদের হার বাড়ানোর পথে যাবে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শিগগির শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ না থাকায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এখনো বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে।
কুইন্টেক্স ইন্টেলের বৈশ্বিক কৌশলবিদ স্টিফেন ইনেস বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগেও বাজারের আলোচনার বড় অংশ ছিল ফেডারেল রিজার্ভ কেন আবার সুদের হার বাড়াবে না, সেটি ব্যাখ্যা করা। এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব সেই হিসাব-নিকাশকে আরও জটিল করে তুলেছে।
একদিকে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া, সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন একই সময়ে একাধিক কৌশলগত চাপের মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হওয়ার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কাও বাড়ছে।
সূত্রঃ নিউজ. কম. এইউ