চীনের জিয়াংসু প্রদেশের নানজিংয়ে উড়াল রেললাইন দিয়ে ছুটে চলেছে একটি উচ্চগতির ট্রেন। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬। ছবি: এএফপি
মেলবোর্ন, ১৪ আগষ্ট- মাত্র ৫ দশমিক ৩ সেকেন্ডে স্থির অবস্থা থেকে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে চীনের একটি পরীক্ষামূলক ম্যাগলেভ ট্রেন। অতি উচ্চগতির এই পরীক্ষাকে ভবিষ্যতের দ্রুতগতির পরিবহন প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের হুবেই প্রদেশের দুংহু ল্যাবরেটরির এক কিলোমিটার দীর্ঘ পরীক্ষামূলক ট্র্যাকে এই রেকর্ড গড়ে ট্রেনটি। ১ দশমিক ১ টন ওজনের ট্রেনটি স্থির অবস্থা থেকে মাত্র ৫ দশমিক ৩ সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতি অর্জন করে।
শুধু উচ্চগতিতে পৌঁছানো নয়, নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে নিরাপদে ট্রেনটিকে থামানোর সক্ষমতাও পরীক্ষায় দেখানো হয়েছে। ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছানোর পর স্বয়ংক্রিয় ব্রেকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে মাত্র ২০০ মিটারের মধ্যে ট্রেনটি নিয়ন্ত্রিতভাবে থেমে যায়।
ছয় মাসে তিনবার বিশ্ব রেকর্ড
গত ছয় মাসে একই পরীক্ষামূলক ট্রেনটি তিনবার স্বল্প দূরত্বে ম্যাগলেভের গতি বৃদ্ধির বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছে।
২০২৫ সালের জুনে প্রথম পরীক্ষায় ট্রেনটি সাত সেকেন্ডে ঘণ্টায় প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার গতি অর্জন করে রেকর্ড গড়ে। পরবর্তী পরীক্ষায় গতি আরও বাড়িয়ে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার এবং পরে ৭৯৮ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় পৌঁছায়।

চীনের জিয়াংসু প্রদেশের নানতোং এলাকায় একটি উচ্চগতির ট্রেন। ছবি: এএফপি
সর্বশেষ পরীক্ষায় ৫ দশমিক ৩ সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটারের মাইলফলক স্পর্শ করে ট্রেনটি নিজের আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যায়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকেরা উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎ সরবরাহ, তড়িৎ-চৌম্বকীয় প্রপালশন, উচ্চগতির লেভিটেশন নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি ব্রেকিং ব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করেছেন।
কীভাবে কাজ করে ম্যাগলেভ ট্রেন?
ম্যাগলেভ বা ম্যাগনেটিক লেভিটেশন ট্রেন চৌম্বক শক্তির সাহায্যে রেললাইনের সামান্য ওপরে ভেসে চলে। ফলে ট্রেন ও ট্র্যাকের মধ্যে সরাসরি ঘর্ষণ থাকে না।
ট্র্যাকের পাশে থাকা কয়েল থেকে তৈরি চৌম্বক ক্ষেত্র ট্রেনটিকে সামনে এগিয়ে নেয়। ঘর্ষণ কম থাকায় প্রচলিত চাকার ট্রেনের তুলনায় ম্যাগলেভ প্রযুক্তিতে অনেক বেশি গতিতে পৌঁছানো সম্ভব।
যাত্রী পরিবহনে এখনো প্রস্তুত নয়
বর্তমানে চীন ও জাপানে চলাচলকারী ম্যাগলেভ ট্রেনগুলোর গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। চীনের ‘ফুক্সিং’ বিশ্বের দ্রুততম বাণিজ্যিক ম্যাগলেভ ট্রেনগুলোর একটি, যার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার।
এদিকে চীনের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলটির গবেষকেরাও অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের এক পরীক্ষায় একটি ট্রেন মাত্র দুই সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৬৯৭ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছেছিল।
তবে সর্বশেষ পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রযুক্তি এখনো সাধারণ যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত নয়। গবেষকদের ধারণা, এই প্রযুক্তিতে অর্জিত জ্ঞান ভবিষ্যতে রকেট ও যুদ্ধবিমান উৎক্ষেপণব্যবস্থার উন্নয়নেও কাজে লাগতে পারে।
বায়ুশূন্য টিউবে ট্রেন চালানোর গবেষণা
অতি উচ্চগতির পরিবহনের লক্ষ্যে চীনা বিজ্ঞানীরা কম চাপ বা প্রায় বায়ুশূন্য টিউবের ভেতর ম্যাগলেভ ট্রেন চালানোর প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা করছেন।
তবে এ ধরনের প্রযুক্তিকে বাস্তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বাধা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল অবকাঠামোগত ব্যয়, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ দূরত্বে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ট্র্যাক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের চ্যালেঞ্জ।
তাই ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটারের এই রেকর্ড অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তিতে বড় অগ্রগতি হলেও সেটিকে বাণিজ্যিক যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের আগে আরও অনেক পরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রয়োজন হবে।