অনেক অভিবাসী সেউতার সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৭ আগষ্ট- স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় এখনো প্রায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার অভিবাসী আটকা পড়ে আছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সেখানে অবস্থান করলেও তাদের আশ্রয়, আইনি অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
সেউতা ও মেলিয়া উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকা ব্যবহার করে আসছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।
গত ২৯ ও ৩০ জুলাই মরক্কো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেন। ওই সময় সাময়িকভাবে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ সেউতায় ঢুকে পড়েছিলেন। পরে তাদের অধিকাংশই স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে যান। স্পেন ও মরক্কোর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের ঘটনায় অন্তত ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে কয়েক হাজার অভিবাসী এখনো সেউতায় রয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে ইরাকি, সিরীয়, ইয়েমেনি, ফিলিস্তিনি, মিসরীয়, আলজেরীয়, তিউনিসীয়, মরক্কান, সুদানি, নাইজেরীয়, সেনেগালিজ, বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন।
আটকে পড়া অনেক অভিবাসী সেউতার এল ত্রাম্পোলিন সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। খড়, কাপড়, কার্ডবোর্ডসহ হাতের কাছে পাওয়া বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে তৈরি এসব আশ্রয়েই তারা রাত কাটাচ্ছেন। পর্যাপ্ত খাবার ও পানির সংকটের পাশাপাশি মানবেতর পরিবেশে দিন পার করতে হচ্ছে তাদের।
কেউ সমুদ্রের পানিতে কাপড় ধুচ্ছেন, আবার কেউ কার্ডবোর্ডের ওপর শুয়ে রাত কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিন অনিশ্চিত অবস্থায় থাকার কারণে তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশাও বাড়ছে।
আটকে পড়া অভিবাসীদের একজন ইরাকের মসুলের তরুণ আবদুলরহমান। কয়েক বছর মরক্কোয় থাকার পর তিনি সেউতায় পৌঁছান। এখন তার আশা, স্পেনে নিজের অবস্থান বৈধ করার সুযোগ পাবেন এবং পরে সুইডেনে যেতে পারবেন। সেখানে তার এক আত্মীয় রয়েছেন।
সিরিয়ার নাগরিক মোহাম্মদও সেউতায় আটকে আছেন। তিনি জানান, মরক্কো থেকে একটি সিরীয় পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশ করেন। পরে কয়েকজন সিরীয়কে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হলেও তিনি সেখানে থেকে যান। তার সন্তান এখনো মরক্কোতে রয়েছে।
ইয়েমেনের আবদুলমাজিদ জানান, মূল প্রবেশের এক দিন আগে তিনি প্রায় আট কিলোমিটার সাঁতরে সেউতায় পৌঁছান। এরপর থেকে খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটাচ্ছেন। ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্পেন তার আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ করবে বলে আশা করছেন তিনি।
মিসরের দুই নাগরিক তারেক ও রমাদান জানিয়েছেন, তারা লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো হয়ে সেউতায় পৌঁছেছেন। তাদের যাত্রাপথে লিবিয়ায় সহিংসতা ও গোলাগুলির মুখেও পড়তে হয়েছে বলে জানান তারা।
সুদানের নাগরিক মুজাম্মিল জানান, ৩০ জুলাই সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর পর প্রথম তিন দিন তার কাছে খাবার ও পানি ছিল না। নাইজেরিয়ার কামারাও এখন ত্রাণ ও স্থানীয় মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছেন।
তবে সেউতায় আটকে থাকা সব অভিবাসীর আইনি পরিণতি এক হবে না। স্পেন প্রত্যেকের আশ্রয়ের আবেদন আলাদাভাবে যাচাই করবে। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী, কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয়ের আবেদন করলে সেই আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে। তবে আবেদন করলেই আশ্রয় পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
এদিকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী এসে পড়ায় সেউতার আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা আশ্রয় ও অভ্যর্থনা ব্যবস্থা আরও সংকটে পড়েছে। অনেক অভিবাসী আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয়ের আবেদন করার জন্য পুলিশের অ্যাপয়েন্টমেন্টও পাচ্ছেন না।
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, গত ১৫ দিনে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ অভিবাসী চিকিৎসা নিয়েছেন। এই সময়ে জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়ার চাপ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এখনো ২৮ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
পরিস্থিতির প্রতিবাদে রোববার সেউতায় শত শত অভিবাসী বিক্ষোভ করেন। তারা আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেউতায় আরও ৫০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে স্পেন। এতে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট সদস্যসংখ্যা ১ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে বড় আকারের সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে মরক্কোও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
সব মিলিয়ে সেউতায় আটকে পড়া হাজার হাজার অভিবাসীর ভবিষ্যৎ এখন স্পেনের আশ্রয়নীতি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের অনেকেই ইউরোপে বৈধভাবে থাকার সুযোগ পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছেন।
সুত্রঃ শাফাক নিউজ