অধ্যাপক ড. সুজন সেন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ আগষ্ট: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজন সেনকে পাঁচ বছরের জন্য সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি এবং সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে অবনমন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাঁর বিরুদ্ধে অযোগ্যতা, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং পছন্দের শিক্ষার্থীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মতো অভিযোগ আনা হলেও, এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর নিজস্ব বক্তব্য এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। রোববার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ড. সুজন সেন আগামী পাঁচ বছর কোনো ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। পাঁচ বছর পর তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এরপর আরও চার বছর পর সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ সহযোগী অধ্যাপক পদে ফিরে আসার ক্ষেত্রে তাঁকে কার্যত নয় বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ বছরের শাস্তির সময়ে তিনি কোনো ইনক্রিমেন্টও পাবেন না।
তবে ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও তার ভিত্তিতে নেওয়া শাস্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে ধরে নেওয়ার পরিবর্তে অভিযোগের ধরন, প্রমাণ, তদন্তের পদ্ধতি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সূত্রপাত ২০২৫ সালের আগস্টে। ওই বছরের ২৫ আগস্ট বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁকে বিভাগে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। পরে ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ছাত্র উপদেষ্টা ও বিভাগীয় সভাপতির কাছে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি সভায় ড. সুজন সেনকে বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত কমিটি অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে ড. সুজন সেনের আচরণকে নৈতিক স্খলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের দাবি। তবে এমন গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট প্রমাণ এবং ড. সুজন সেনের লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য জনসমক্ষে না থাকায় বিষয়টির বিভিন্ন দিক নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-১৯৭৩-এর ৫৫(৩) ধারা অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনকে ওই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। কমিটির অন্য সদস্য ছিলেন সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম-২ এবং ড. সুজন সেন মনোনীত একজন প্রতিনিধি।
ড. সুজন সেনের পক্ষ থেকে এই প্রক্রিয়ায় নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ এবং তাঁর মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে তদন্তে অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষকের দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার ও পেশাগত মর্যাদার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অভিযোগের পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তির ব্যাখ্যা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
গত ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩৭তম সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। পরে তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের অব্যাহতি এবং পদ অবনতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে ড. সুজন সেনকে পাঁচ বছর একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বাইরে থাকতে হবে। এরপর সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজে ফিরলেও সহযোগী অধ্যাপক পদে ফেরার জন্য তাঁকে আরও চার বছর অপেক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি পাঁচ বছর কোনো বেতন ইনক্রিমেন্টও পাবেন না।
এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি শাস্তির কারণে ড. সুজন সেনের পেশাগত জীবন ও ভবিষ্যৎ পদোন্নতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। ফলে অভিযোগের পাশাপাশি তদন্তের স্বচ্ছতা, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, সেটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তাঁর পক্ষের বক্তব্য বা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে একপাক্ষিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও সব পক্ষের বক্তব্যের প্রতিফলনও নিশ্চিত করা জরুরি।