মেলবোর্ন, ১৯ আগষ্ট: ভারতের সঙ্গে নবায়ন হতে যাওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। পানি অধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামেও যাওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী আনী।
মঙ্গলবার ঢাকায় ‘গঙ্গা পানি চুক্তি: পুনর্নির্ধারণের বিষয়সমূহ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) সেমিনারটির আয়োজন করে।
শহীদউদ্দিন চৌধুরী আনী বলেন, বাংলাদেশের জন্য গঙ্গার পানি বণ্টনে একটি চুক্তি থাকা জরুরি। চুক্তি ছাড়া সামনে এগোনোর কোনো সুযোগ নেই এবং এটি বাংলাদেশের অধিকার।
তিনি বলেন, ঢাকা গঙ্গার পানি চুক্তি পুনর্নবীকরণের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আগামী মাসে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বলতে এমন একটি বিধানকে বোঝায়, যার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বা নদীর পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে ভাটির দেশকে ন্যূনতম পরিমাণ পানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।
পানিসম্পদমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতের পানি বণ্টন চুক্তিতে তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করার বিধানও থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি ১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি চুক্তিতে থাকা ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে এই বিধানটি রাখা হয়নি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ চুক্তির মাধ্যমে সমাধান চায়। তবে প্রয়োজন হলে পানি অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দ্বারস্থ হতেও প্রস্তুত রয়েছে ঢাকা। একই সঙ্গে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অধিকার ও অনুভূতিকে সম্মান করার আহ্বান জানান তিনি।
ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি সই হয়। মূলত শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি ভাগাভাগির বিষয়টি এই চুক্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা।
তবে নতুন চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি বলে জানিয়েছে ভারত।
বাংলাদেশের অসন্তোষের অন্যতম কারণ হলো শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য পানির নিশ্চয়তা না থাকা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএমপিআরআইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান পানি বণ্টন কাঠামো পুরোনো জলপ্রবাহের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ এখন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ চুক্তিতে পরিবেশগত বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানাচ্ছে। এর মধ্যে উজানে পানি প্রত্যাহার, নদীর স্বাস্থ্য, লবণাক্ততা এবং পরিবেশের প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহের বিষয় রয়েছে।
ফারাক্কা ব্যারাজ নিয়ে পুরোনো বিরোধ
গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম বিতর্কিত বিষয় ফারাক্কা ব্যারাজ। পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার ওপর নির্মিত এই স্থাপনার মাধ্যমে হুগলি নদী ব্যবস্থায় পানি প্রবাহিত করা হয়।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে শুষ্ক মৌসুমে ভাটিতে পানির প্রবাহ কমে যায়। পানিসম্পদমন্ত্রীও ফারাক্কা ব্যারাজকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের ‘মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি দাবি করেন, ফারাক্কার পর ভারত গঙ্গার ওপর আরও ব্যারাজ এবং প্রায় ৯০০টি বাঁধ বা প্রতিরোধক স্থাপনা নির্মাণ করেছে, যা দুই দেশের মধ্যে পানি নিয়ে বিরোধ আরও বাড়িয়েছে।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, ফারাক্কা ব্যারাজ কোনো বাঁধ নয়, এটি একটি পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও সরানোর কাঠামো। এর মাধ্যমে গেটের সাহায্যে গঙ্গার প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি ফারাক্কা খালে প্রবাহিত করা হয় এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়।
ভারতের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে পানিপ্রবাহের তথ্য বাংলাদেশকে দেওয়া হয়।
তিস্তা নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি সম্পর্কের ক্ষেত্রে গঙ্গার পাশাপাশি তিস্তা নদীর পানি বণ্টনও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়।
গত জুলাইয়ে ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নের আলোচনা ‘আর বিলম্ব না করে’ শুরু করার সুপারিশ করে। কমিটি বলেছে, নতুন চুক্তির আলোচনায় হালনাগাদ পানিপ্রবাহের তথ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় সরকার দেশটির সংসদকে জানিয়েছিল, গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ভারতের অবস্থান নির্ধারণে বিবেচনা করা হয়েছে।
এর মাত্র দুই দিন আগে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, দীর্ঘদিনের এই অমীমাংসিত বিষয়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অবনতি চায় না। একই সঙ্গে ভারতের নিজস্ব স্বার্থের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ ও ভারত ৫৪টি অভিন্ন নদী ভাগ করে। এর মধ্যে গঙ্গা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন নদী ও পানি বণ্টনসংক্রান্ত বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়।
সূত্র-দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া