‘নিজের সন্তানই নিরাপদ নয়’, মেয়ের দুর্ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তার ক্ষোভ
সকালে নিজ হাতে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা আনসারুল করিম। দুপুরে স্কুল ছুটির পর বাসার সামনে মেয়েকে নামানোর সময় দ্রুতগতির ব্যাটারিচালিত…
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে আদিবাসী ওরাঁও জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের প্রতি আগ্রহ ও ধর্মান্তরের প্রবণতা বাড়ছে। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে দিনাজপুর, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী সারনা ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছেন বহু ওরাঁও। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রায় ৫ হাজার বৌদ্ধ অনুসারী এবং ২৫টি বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওরাঁওদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় বিশ্বাস সারনা। এ বিশ্বাসে প্রকৃতি ও পূর্বপুরুষের আত্মার উপাসনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক ওরাঁও পরিবার তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মীয় রীতি থেকে সরে এসে ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্মসহ বিভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করছে।
দিনাজপুরের ওরাঁও সম্প্রদায়ের ৪৩ বছর বয়সী শাপন এক্কা জানান, তিনি ছোট থাকতেই তাঁর বাবা-মা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। পরে তাঁদের অনুসরণ করে তিনিও এই ধর্মের চর্চা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর পরিবারসহ আশপাশের প্রায় ২০টি পরিবার বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে এক প্রবীণ বৌদ্ধ ভিক্ষু রংপুরের ওরাঁও অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে তাঁদের ধর্মীয় কিছু মন্ত্রের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের মন্ত্রের মিল খুঁজে পান। এ থেকে তিনি ওরাঁও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রাচীন বৌদ্ধধর্মের কোনো ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা তুলে ধরেন। এরপর ওই এলাকার কিছু মানুষ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে দিনাজপুর ও আশপাশের এলাকায়ও এর বিস্তার ঘটে।
উত্তরবঙ্গ বৌদ্ধ ফেডারেশনের সভাপতি শাপন এক্কা বলেন, তাঁরা কোনো আর্থিক সুবিধা বা পার্থিব লাভের আশায় বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেননি। নিজেদের বিশ্বাস থেকেই তাঁরা এই ধর্ম বেছে নিয়েছেন। তাঁর মতে, শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য অনেক মানুষ একটি নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় জীবন খুঁজছেন এবং বৌদ্ধধর্ম তাঁদের সেই সুযোগ দিচ্ছে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম মানুষ বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করেন। দেশের অধিকাংশ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায়। এর বাইরে কুমিল্লা ও নোয়াখালীতেও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
তবে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের সম্পর্ক বহু পুরোনো। নওগাঁর সোমপুর মহাবিহার তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পাল রাজাদের আমলে অষ্টম শতকের শেষ দিকে নির্মিত এই মহাবিহার প্রাচীন বাংলার অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধবিহার ছিল। একসময় এটি দেশ-বিদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। উত্তরাঞ্চলের বগুড়ার ভাসু বিহার ও নওগাঁর জগদ্দল বিহারসহ আরও কয়েকটি প্রাচীন স্থাপনাও এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের ঐতিহাসিক প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করছে।
বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারী সুকোমল বড়ুয়া মনে করেন, উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, একসময় এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। ওরাঁও জনগোষ্ঠীর একটি অংশের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণকে তিনি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখছেন।
উত্তরাঞ্চলে বৌদ্ধ অনুসারীর সংখ্যা বাড়লেও ধর্মীয় চর্চা পরিচালনায় রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। শাপন এক্কার তথ্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের ২৫টি বৌদ্ধ মন্দিরের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে ভিক্ষু রয়েছেন।
ভিক্ষুর স্বল্পতার কারণে নতুন অনুসারীরা নিয়মিত ধর্মীয় শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পর্যাপ্ত ধর্মীয় অবকাঠামো ও সেবার ব্যবস্থা না করা গেলে ভবিষ্যতে নতুন অনুসারীদের কেউ কেউ বৌদ্ধধর্ম থেকে দূরে সরে যেতে পারেন বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ, উচ্ছেদ ও সহিংসতার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আসছে। ২০১৬ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদের সময় পুলিশের গুলিতে তিনজন নিহত ও অনেকে আহত হন। পরে সাঁওতালদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগও ওঠে। ২০২৪ সালে দিনাজপুরে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া যায়।
তবে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পর নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ বা বৈষম্যের মুখে পড়তে হয়নি বলে জানান শাপন এক্কা।
উত্তরাঞ্চলে মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টানদের পাশাপাশি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর উপস্থিতিও বাড়ছে। বিশেষ করে ঐতিহ্যগতভাবে প্রকৃতি ও পূর্বপুরুষের উপাসনা করা জনগোষ্ঠীর মধ্যেই বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের প্রবণতা বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু আদিবাসী খ্রিষ্টান পরিবারও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে।
রংপুরের একটি মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতিকে শক্তিশালী করছে। তাঁর মতে, বৌদ্ধধর্মের প্রতি আগ্রহ বাড়া ধর্মীয় স্বাধীনতারই একটি প্রতিফলন। তবে কাউকে কোনো ধরনের প্রলোভন বা অন্যায় উপায়ে ধর্মান্তরিত করা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে হিন্দু পুরোহিত দেশবিশেষ বিশ্বাসের অভিযোগ, দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষকে শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বৌদ্ধধর্মে নেওয়া হচ্ছে। তবে শাপন এক্কা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁরা কোনো আর্থিক বা বস্তুগত সুবিধার আশায় ধর্ম পরিবর্তন করেননি।
বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পর তাঁদের জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এসেছে বলেও জানান শাপন এক্কা। তাঁর ভাষ্য, আগে অনেকেই ঘরে তৈরি চালের মদ পান করতেন। বৌদ্ধধর্মের শিক্ষার কারণে নতুন অনুসারীদের মধ্যে এ ধরনের পানীয় থেকে বিরত থাকার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার প্রতিও তাঁদের আগ্রহ বেড়েছে।
শাপন এক্কা বলেন, বর্তমানে ওরাঁও জনগোষ্ঠীর অনেকেই আগের তুলনায় বেশি শিক্ষিত ও সচেতন। কেউ কেউ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি করছেন এবং নিজেদের অধিকার নিয়েও আগের চেয়ে বেশি সোচ্চার হচ্ছেন। তাঁদের মতে, ধর্মীয় পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার এই অগ্রগতিও সম্প্রদায়ের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সুত্রঃ Religion Unplugged
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au