নিজ বাসায় ঝুলছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালকের মরদেহ
চট্টগ্রামের হালিশহরে নিজ বাসা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ ছায়েদুর রহমানের (৫৫) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে উত্তর…
বাংলাদেশ নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে আরও উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ তথ্য জানান। তাঁর পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে আরেকটি ‘দারুণ চুক্তির’ কথা উল্লেখ করা হয়।
এর পর থেকেই বাংলাদেশে নতুন করে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত কতটা প্রয়োজনীয় এবং এর পেছনে কেবল বাণিজ্যিক প্রয়োজন কাজ করছে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও বিবেচনায় রয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে বোয়িংয়ের একটি চুক্তি হয়। ওই চুক্তির আওতায় ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স। উড়োজাহাজগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
এখন সার্জিও গরের বক্তব্যের পর ধারণা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশ বোয়িংয়ের কাছ থেকে এর বাইরেও আরও উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ বিমানের বহরে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজই বেশি। ছবি: সংগৃহীত
অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত
নতুন করে উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন সরকার দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নানা সংকটের কথা বলছে। একই সময়ে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে এবং অর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে বড় প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারকে সতর্ক হতে হচ্ছে।
নতুন ঋণের জন্য গত জুনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে চিঠিও দিয়েছে বাংলাদেশ। অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও আর্থিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, নতুন উড়োজাহাজ কেনা এখন কতটা জরুরি। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে, বিমানগুলো কি যাত্রী চাহিদা পূরণের জন্য কেনা হচ্ছে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যেও এর কোনো ভূমিকা রয়েছে।
এর পেছনে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, কোনো ধরনের চাপের কারণে নয়, বাংলাদেশের প্রয়োজন ও চাহিদা বিবেচনা করেই বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে দেশের এভিয়েশন খাতে ৭০ থেকে ৮০টি বড় উড়োজাহাজের প্রয়োজন হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের আর্লিংটনে বোয়িং সংস্থার সদর দফতর। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের বাজার দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ)–এর বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক রুটে যে বাজার রয়েছে, তার প্রায় ২৫ শতাংশ বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সের নিয়ন্ত্রণে। বাকি প্রায় ৭৫ শতাংশ বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের বহরে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। আরও ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
এর পাশাপাশি বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি ইতোমধ্যে হয়েছে।
এয়ারবাসও বাংলাদেশকে আরও ১০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের প্রস্তাবে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং চারটি এ৩২১ নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ রয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বিমান যাত্রীর সংখ্যা আগামী বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। বর্তমানে বছরে প্রায় এক কোটি যাত্রী পরিবহন হচ্ছে। আগামী এক দশকে এ সংখ্যা আড়াই কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাব্য যাত্রী চাহিদার তুলনায় কতটি উড়োজাহাজ প্রয়োজন হবে এবং নতুন উড়োজাহাজগুলো কীভাবে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা হবে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, আগে থেকে উড়োজাহাজের অর্ডার দিলে তুলনামূলক কম দামে কেনার সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে আগামী এক দশকে যাত্রী সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তাঁর মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বাজারের বড় অংশ বিদেশি এয়ারলাইন্স নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে দেশের নিজস্ব বিমান সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বড় বহর পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, গত ৫৪ বছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। ফলে সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়া বড় বহর গড়ে তোলা হলে একসময় এসব উড়োজাহাজই প্রতিষ্ঠানের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর মতে, যাত্রী বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা করা গেলে নতুন উড়োজাহাজ কেনা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হতে পারে।
আরেক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, উড়োজাহাজ কেনার পেছনে বাণিজ্যিক পরিকল্পনাটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

নতুন উড়োজাহাজের জন্য প্রয়োজন হবে অনেক প্রকৌশলী পাইলট ও টেকনিশিয়ানের। ছবি: সংগৃহীত
তাঁর মতে, যাত্রী ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে কতটি উড়োজাহাজ প্রয়োজন, কোন রুটে সেগুলো পরিচালনা করা হবে এবং কীভাবে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসবে, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে পরিকল্পিতভাবে বহর সম্প্রসারণ করা গেলে বাংলাদেশ এ থেকে লাভবান হতে পারে। এজন্য শুধু উড়োজাহাজ কেনাই যথেষ্ট নয়, পর্যাপ্ত পাইলট ও প্রকৌশলী তৈরি, প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতিও নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের এয়ারক্রাফট বহরের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। তা না হলে নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করা সম্ভব হবে না এবং আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।
সরকারের দাবি, কোনো চাপের কারণে নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি এভিয়েশন চাহিদা বিবেচনা করেই বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
তবে বড় অঙ্কের এই বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক হবে, তা নির্ভর করবে উড়োজাহাজগুলোর সঠিক ব্যবহার, রুট পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক সক্ষমতার ওপর।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au