২৮ আগস্ট আকস্মিক বন্যার পর নেপালের দেবঘাট গ্রাম ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ছবি: রিতেশ শুক্লা/গেটি ইমেজেস
নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ১ হাজার ২০৪ জন এবং তিব্বতে ২১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ৭৫৭ জন। দুর্যোগের এক সপ্তাহ পর নতুন করে এই হতাহতের হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে।
বুধবার নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যের বরাতে এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর নেপাল এখন শুধু প্রচলিত ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি সামনে আনছে। দেশটি এ বিষয়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো বড় দেশগুলোর কাছে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে নেপালের দায় অত্যন্ত সামান্য হলেও এর ভয়াবহ প্রভাব দেশটিকে ব্যাপকভাবে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তার ভাষায়, এটি দয়া বা দানের বিষয় নয়, বরং ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি।
কাঠমান্ডু পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খানাল বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান প্রায় নগণ্য। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া, পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে নেপালের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এই বাস্তবতায় দেশের কূটনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মূলত ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা চাওয়া হলেও এখন জলবায়ু ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেপালের যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া দেশটির নৈতিক ও আইনি অধিকার। তাই ভবিষ্যতে নেপালকে শুধু দাতব্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না থেকে জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য হিস্যার দাবি তুলতে হবে।
এদিকে ভয়াবহ দুর্যোগের পর দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসে মাটির নিচে চাপা পড়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন সুড়ঙ্গেও উদ্ধারকাজ চলছে। ত্রিশূলী ৩এ, চিলিম ও আপার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়াদের উদ্ধারে বিভিন্ন দেশের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল কাজ করছে।
ভারতের বিশেষায়িত টানেল উদ্ধারকারী দল চিলিম ও লাংতাং এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। চীনের একটি উদ্ধারকারী দল ত্রিশূলী ৩এ প্রকল্প এলাকায় কাজ করছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিশেষায়িত দল আপার ত্রিশূলী প্রকল্পে উদ্ধার অভিযানে যুক্ত হয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ভূমিধস এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছাতেও সমস্যা হচ্ছে। তবে নিখোঁজদের উদ্ধারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন নেপালের কর্মকর্তারা।
উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে নেপাল সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে তাদের পুনর্বাসনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সরকার জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ইতোমধ্যে ৫ বিলিয়নের বেশি নেপালি রুপি জমা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কার্যক্রমে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
তবে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারলে হতাহতের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে ভয়াবহ এই দুর্যোগ আবারও হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।