‘অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর’, ভোলায় স্পিকারের মন্তব্য
অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে দেশের অর্থ লুটপাট ও বিদেশে পাচার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।…
ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৯৯,৯৯২টি ফৌজদারি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের তুলনীয় ছয় মাসের ৯২,২১১টির চেয়ে ৮.৪ শতাংশ বেশি। শুধু মার্চ ও এপ্রিলেই ৬০৫টি হত্যা, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি সব সময় অপরাধ বৃদ্ধির নিখুঁত প্রমাণ নয়। মানুষের পুলিশের কাছে যাওয়ার সুযোগ, অনলাইন জিডি এবং উন্নত রিপোর্টিংও সংখ্যা বাড়াতে পারে। কিন্তু হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, মব সহিংসতা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষ যখন একই সঙ্গে দৃশ্যমান হয়, তখন শুধু “রিপোর্টিং বেড়েছে” বলে রাষ্ট্র দায় শেষ করতে পারে না।
আওয়ামী লীগ আমলের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বিরোধীদের দমন এবং জুলাই ২০২৪ এর রক্তপাত ইতিহাসের গুরুতর কলঙ্ক। কিন্তু আগের সরকারের অপরাধ বর্তমান সরকারের জন্য চিরস্থায়ী নৈতিক ছাড়পত্র হতে পারে না। নতুন সরকার যদি প্রতিটি ব্যর্থতার উত্তরে পুরোনো সরকারের নাম বলে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, দেশ কি সরকার বদলেছে, নাকি শুধু অজুহাতের মালিকানা বদলেছে?
২০২৪ সালের পুরো বছরে আইন ও সালিশ কেন্দ্র ৪০১টি ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই, মাত্র সাত মাসে, সেই সংখ্যা ৪০০। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩৭ জনকে।
শিশুদের অবস্থা আরও মর্মান্তিক। জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৪৬ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে এবং ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টার পর অন্তত ১৭ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় নিহত হয়েছে অন্তত ১৯৫ শিশু।
আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, কার্ডের গল্প বলি, কূপ খননের গল্প বলি। কিন্তু একটি সাত বছরের শিশু নিজের ঘর, বিদ্যালয় বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ কি না, সেই পরিমাপটি উন্নয়নের সূচকে কোথায় রাখব? রাষ্ট্রের অগ্রগতি যদি শিশুর আর্তনাদ অতিক্রম করে সামনে চলে যায়, তবে সেটিকে অগ্রগতি না বলে নৈতিক পশ্চাৎপসরণ বলাই অধিক সঠিক।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হিসেবে পুলিশের কাছে রিপোর্ট হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩,৬৭৯ জন উদ্ধার হয়েছে অথবা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এটি অবশ্যই স্বস্তির সংবাদ। কিন্তু এখনও ২,০৩৮ শিশুর সন্ধান নেই, মোটের প্রায় ১৩ শতাংশ।
২০২৩ সালের পূর্ণ বছরে নিখোঁজসংক্রান্ত জিডি ছিল ১৭,৮০৮টি এবং ২০২৪ সালে ১৬,৪১৪টি। আর ২০২৬ সালের মাত্র সাত মাসেই ১৫,৭১৭টি। মাসিক গড়ে ২০২৩ সালে প্রায় ১,৪৮৪, ২০২৪ সালে ১,৩৬৮ এবং ২০২৬ সালে প্রায় ২,২৪৫টি রিপোর্ট হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের মাসিক রিপোর্টের হার ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬৪ শতাংশ বেশি।
পুলিশ বলেছে, অনলাইন জিডি চালু হওয়ায় রিপোর্টের সংখ্যা বেড়েছে। ব্যাখ্যাটি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু অনলাইন জিডি ২,০৩৮ শিশুকে অদৃশ্য করেনি। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া রাষ্ট্রের পরিসংখ্যান, কিন্তু সেই শিশুর পরিবারের কাছে প্রতিটি সকাল একটি নতুন শোক।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাবে জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত বারো মাসে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ১,০৪৫টি সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা এবং ৪৫টি মৃত্যুর অভিযোগ ছিল। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সংগঠনটি ২৫৭টি ঘটনা এবং ৪৪ জন নিহত হওয়ার দাবি করেছে।
দুটি প্রতিবেদন একই সময়সীমার নয় এবং সব মৃত্যুর সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে প্রমাণিতও নয়। সরকার বা পুলিশ অনেক ঘটনাকে জমি, ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা সাধারণ অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করতে পারে। প্রতিটি ঘটনাকে প্রমাণ ছাড়া সাম্প্রদায়িক হত্যা বলা যেমন ভুল, তেমনি নিরপেক্ষ তদন্তের আগে সবকিছুকে সাধারণ অপরাধ বলে ছোট করাও ভুল।
তবে সংখ্যাটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আগের বারো মাসে ৪৫ মৃত্যু, ২০২৬ সালের ছয় মাসে দাবি করা হয়েছে ৪৪ মৃত্যু। ঘটনার সংখ্যা কম দেখালেও প্রাণহানির তীব্রতা কমেনি। রাষ্ট্র যদি সংখ্যালঘুকে শুধু উৎসবের দিনে নিরাপত্তা দেয় এবং বছরের বাকি দিন তাকে নিজের পরিচয় নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হয়, তাহলে সেটি ধর্মীয় সম্প্রীতি নয়, পাহারাদারির বিরতিতে সহাবস্থান।
বর্তমান সরকারের সবচেয়ে নিয়মিত কর্মসূচি সম্ভবত ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড নয়, আওয়ামী লীগের ওপর দায় স্থানান্তর কর্মসূচি। গ্যাস নেই, আওয়ামী লীগ দায়ী। বিদ্যুৎ নেই, আওয়ামী লীগ দায়ী। ব্যাংক দুর্বল, আওয়ামী লীগ দায়ী। আইনশৃঙ্খলা খারাপ, পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্র দায়ী। দ্রব্যমূল্য বেশি, আগের নীতি দায়ী।
মনে হচ্ছে, বর্তমান সরকারের সবচেয়ে কর্মক্ষম প্রতিষ্ঠানটির নাম হতে পারে, “অতীত বিষয়ক দায় স্থানান্তর মন্ত্রণালয়।”
আওয়ামী লীগের সময় দুর্নীতি, গুম, রাজনৈতিক দমন, ব্যাংকিং অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ চুক্তি এবং জুলাই ২০২৪ এর রক্তপাত ঘটেছে। এসব অস্বীকার করা ইতিহাস অস্বীকার করার সমান। বর্তমান সরকার গভীর সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, এটিও সত্য।
কিন্তু জনগণ বিএনপিকে আওয়ামী লীগের অপরাধের ধারাভাষ্য দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করেনি। তারা বর্তমান সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করেছে। উত্তরাধিকার পাওয়া এবং ছয় মাস ধরে শুধু উত্তরাধিকারের তালিকা পাঠ করা এক বিষয় নয়।
নির্বাচনের আগে তারেক রহমান বলেছিলেন, ২০০১ সালে খালেদা জিয়া দেশকে দুর্নীতি থেকে বের করে এনেছিলেন। অথচ Transparency International এর Corruption Perceptions Index এ বাংলাদেশ ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল।
বিএনপির ব্যাখ্যা হলো, ২০০১ সালের ফল আগের সরকারের সময়ের তথ্য প্রতিফলিত করেছিল। প্রথম বছরের ক্ষেত্রে সময়গত ব্যাখ্যাটি আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ২০০২, ২০০৩, ২০০৪ ও ২০০৫ সালের অবস্থানও কি আগের সরকারের নামে লিখে দেওয়া হবে?
“বিএনপি দেশকে দুর্নীতি থেকে বের করেছিল”, বক্তব্যটি ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নয়। এটি সুবিধাজনক অংশ বেছে তৈরি করা রাজনৈতিক স্মৃতি। ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক স্মৃতি খুব বাছাই করে কাজ করে, অস্বস্তিকর বছরগুলোকে সে সহজেই চিনতে পারে না।
বর্তমান সরকার “Bangladesh First” নীতির কথা বলেছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের চেষ্টা করেছে। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ১.১ বিলিয়ন ডলার জরুরি অর্থায়ন একটি বাস্তব ইতিবাচক অর্জন। খাদ্য, সার, জ্বালানি এবং সংকটে থাকা পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে সহায়তার জন্য এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংগ্রহ আর কূটনৈতিক সাফল্য এক বিষয় নয়। ঋণ পাওয়া কখনো আন্তর্জাতিক আস্থার চিহ্ন, আবার কখনো দেশের সংকটের গভীরতারও প্রমাণ।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখনও অস্বস্তিকর। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনিশ্চিত এবং দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে, কিন্তু ভারত ও চীনের মাঝখানে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বক্তৃতায় যত সহজ, বাস্তবে ততটাই কঠিন। ফুটবল না হয়ে রেফারি হওয়ার ঘোষণা আকর্ষণীয়, কিন্তু রেফারি হতে হলে দুই পক্ষকেই আপনার বাঁশির বৈধতা মানতে হয়।
বর্তমান সরকারের সব সংকট তারেক রহমান সৃষ্টি করেছেন, এটি সত্য নয়। আবার কোনো সংকটের জন্যই তাঁর সরকার দায়ী নয়, এটিও সত্য নয়।
মূল্যস্ফীতি ১১.৬৬ শতাংশের সংকটপূর্ণ উচ্চতা থেকে ৮.২৬ শতাংশে নেমেছে, এটি ইতিবাচক। বিশ্বব্যাংকের ১.১ বিলিয়ন ডলার জরুরি অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের ধারণার মধ্যে সামাজিক সুরক্ষার সম্ভাবনা আছে। গ্যাস অনুসন্ধানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজনীয়।
কিন্তু প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান বিশাল। ৪১ লাখ ফ্যামিলি কার্ডের লক্ষ্যের বিপরীতে প্রথম পর্যায়ে ৩৭,৫৬৭ নারী, ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষকের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের বিপরীতে ২২,০৬৫ কৃষক, ব্যাংকের প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকা খেলাপি, দৈনিক ১,২০০ থেকে ১,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি, কোনো কোনো সময় ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতি, সাত মাসে ৪০০ ধর্ষণ এবং এখনও নিখোঁজ ২,০৩৮ শিশু।
এই সংখ্যাগুলোর সামনে বিজ্ঞাপনের বাজারের থলেটি বড় অসহায় মনে হয়।
মানুষ কার্ডের রং দেখে বাজার করে না, বিদ্যুতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাখা চালায় না, কূপ খননের পরিকল্পনা দিয়ে চুলায় আগুন জ্বালায় না এবং সরকারি বিজ্ঞাপনের ধমক শুনে সন্তানের নিরাপত্তা ফিরে পায় না।
বিজ্ঞাপন শেষ হলে টেলিভিশনের পর্দায় অন্য অনুষ্ঠান শুরু হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে বিজ্ঞাপন শেষ হলে বৃদ্ধাকে আবার সেই বাজারেই যেতে হয়, যেখানে ২০২১ থেকে ২০২২ সালের ১০০ টাকার পণ্যের জন্য এখন প্রায় ১৫২ টাকা দিতে হয়। তাঁর কার্ডে যদি ২,৫০০ টাকা আসে, সেটি অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য সহায়তা। সেটিকে সরকারের অনুগ্রহ হিসেবে দেখিয়ে সমালোচকদের ধমক দেওয়ানো তাঁর দারিদ্র্যকেই রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা।
প্রশ্ন করা অকৃতজ্ঞতা নয়। জনগণের অর্থে পরিচালিত সরকারকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা নাগরিকের অধিকার।
প্রতিশ্রুতির বাংলাদেশে এখন কার্ডের অভাব নেই। ফ্যামিলি কার্ড আছে, কৃষক কার্ড আছে, স্পোর্টস কার্ড আছে। শুধু মানুষের সবচেয়ে জরুরি কার্ডটি এখনও সক্রিয় হয়নি, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, মেধা ও মর্যাদার নাগরিকত্বের কার্ড।
তিন পর্বের ধারাবাহিক আয়োজনের শেষ পর্ব আজ প্রকাশিত হলো। সঙ্গে থাকুন ওটিএন বাংলার সঙ্গে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au