বাংলাদেশ বর্তমানে চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করছে।ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও অবকাঠামো খাতে বেইজিংয়ের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় ঢাকার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়লে তা নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার জটিল সম্পর্ককে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করছে। এর মাধ্যমে ঢাকা একদিকে চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সুবিধা নিতে চাইছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও চীন কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা নিয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ৩০ আগস্ট চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এ উদ্যোগের কথা জানান। এর ফলে অবকাঠামো ও বাণিজ্যের পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সহযোগিতার নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক শাফি মোস্তফার মতে, এই সংলাপের আঞ্চলিক কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তার ভাষায়, চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও ভারতসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখছে ঢাকা। একক কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়াতে বাংলাদেশের এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতি কার্যকর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি ভারতের জন্য সংবেদনশীল হতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ২০ থেকে ২৪টি চেংদু জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। চতুর্থ প্রজন্মের এই যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২৩০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
শাফি মোস্তফা বলেন, বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা। তার মতে, অর্থনৈতিক স্বার্থ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোতে চীনের ভূমিকা বাড়ায় বেইজিংকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
তিনি মনে করেন, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এমনভাবে পরিচালনা করা হবে, যাতে কোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা উন্নয়ন অগ্রাধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দ্রুত বেড়েছে। এ সময় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ১৫টি নতুন সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জুন মাসে বেইজিং সফরের সময় ১১টি চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে মোট ৯২১ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষক উমের করিমের মতে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হওয়ার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আরও স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান তৈরির চেষ্টা স্পষ্ট হচ্ছে। তার ভাষায়, বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে শুধু অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান তৈরি করতে চাইছে।
উমের করিম আরও বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ একটি বিকল্প হতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে ঢাকা উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতাও বাড়াতে পারছে। ফলে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত নির্ভরতা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে জটিল হয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পর ভারতে অবস্থান করায় দুই দেশের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের বিষয়টিও ভারতের কাছে তুলে ধরেছে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশটির তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদেরই চীন সফরের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, বাংলাদেশে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে একটি বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ সমর্থন রয়েছে। বিএনপি সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ধরনের পররাষ্ট্রনীতিতেও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
জন ড্যানিলোভিচের মতে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই প্রভাব ফেলবে না, বরং মিয়ানমার ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তর ভূরাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে চীনের সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ থাকলে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ থেকে আসা চাপের ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।
তবে বিশ্লেষকদের কেউই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন না। নিরাপত্তা বিশ্লেষক নীলান্থি সমরনায়েকে বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও চীন বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী ছিল। সাশ্রয়ী প্যাকেজের আওতায় বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে আধুনিক সামরিক বিমানসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে এবং এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ সহায়তাও ছিল।
তার মতে, ভারতের সঙ্গে বৈরিতা তৈরি করা বাংলাদেশের স্বার্থে নয়। একই সময়ে অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশের যত বেশি সম্ভব অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও এটিকে সরাসরি ভারতবিরোধী অবস্থান হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও বহুমুখী অংশীদারত্ব তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।