বিশ্ব

বেইজিংয়ের চাপ প্রয়োগে কোয়ালিশনের কেউ কেউ ‘খুশি’ ছিলেন: সাবেক চীনা রাষ্ট্রদূত

  • 10:11 pm - September 12, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩৪ বার
চীনে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার সাবেক রাষ্ট্রদূত গ্রাহাম ফ্লেচার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। (এএপি: লুকাস কক)

চীনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্কের টানাপোড়েনের সময় বেইজিংয়ের চাপ প্রয়োগকে ঘিরে তৎকালীন মরিসন সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন দেশটির সাবেক চীনা রাষ্ট্রদূত গ্রাহাম ফ্লেচার। তাঁর দাবি, কোয়ালিশন সরকারের কিছু ব্যক্তি চীনের টার্গেট হওয়ায় ‘প্রায় আনন্দিত’ ছিলেন এবং চীনা কূটনীতিকদের দেওয়া কথিত ‘১৪ দফা অভিযোগের তালিকা’ বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শন করে বেড়িয়েছেন।

একই সঙ্গে চীনের বর্তমান রাজনৈতিক গতিপথ নিয়েও সমালোচনা করেছেন ফ্লেচার। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন ক্রমেই আত্মতুষ্ট ও নতুন চিন্তার প্রতি বন্ধ হয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ দেশটির উদ্যোক্তা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

গ্রাহাম ফ্লেচার অস্ট্রেলিয়ার চীনবিষয়ক অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের একজন। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি বেইজিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তাঁর দায়িত্বের সময়েই ২০২০-২১ সালে দুই দেশের সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে এবং ২০২২ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

কোভিড-১৯ মহামারির উৎস নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিলেন তৎকালীন অস্ট্রেলীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিস পেইন। এর পরেই অস্ট্রেলিয়ার প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় বেইজিং।

মরিসন সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় চীন। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার কয়েক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাধা আরোপ করা হয়।

এই টানাপোড়েনের চরম পর্যায়ে চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা অস্ট্রেলীয় এক সাংবাদিকের হাতে ‘১৪টি অভিযোগের’ একটি তালিকা তুলে দেন। চীনের অভিযোগের মধ্যে ছিল চীনা বিনিয়োগে বাধা, চীনের সমালোচনা করে এমন থিংকট্যাংককে সরকারি অর্থায়ন এবং অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় নতুন আইনসহ আরও বিভিন্ন বিষয়।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড্যারেন লিমের উপস্থাপনায় ‘অস্ট্রেলিয়া ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফ্লেচার বলেন, ওই ১৪ দফা তালিকা প্রকাশ করে চীন কার্যত ‘নিজের গোল নিজেই করেছে’।

তিনি বলেন, ‘‘এটা আমাদের জন্য এমন একটি সুযোগ ছিল, যেখানে আমরা বলতে পারতাম, ‘এ ধরনের কথা বলবেন না। আপনারা আমাদের এমন কিছু পরিবর্তন করতে বলছেন, যা আমাদের নিজেদের পরিচয়ের অংশ।’ এটা কখনোই হবে না এবং এটি অযৌক্তিক।’’

তবে ফ্লেচার স্পষ্ট করেন, ওই তালিকাটি চীনা সরকারের আনুষ্ঠানিক দাবিপত্র ছিল না। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার কিছু রাজনীতিক ও বিশ্লেষক বিষয়টিকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং কূটনৈতিক সমাধানের বদলে সংঘাতকে উপভোগ করেছিলেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও তাঁর সমালোচনা করেছেন ফ্লেচার।

তিনি বলেন, ‘‘আমি শুনেছিলাম, আমাদের সরকারের একজন সদস্য তালিকাটি লেমিনেট করে ফেলেছিলেন এবং বিদেশে গেলে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সেটি দিতেন।’’

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ করমর্দন করছেন। (চায়না ডেইলি/রয়টার্স)

ফ্লেচারের মতে, এ ধরনের আচরণ দুই দেশের বিরোধ আরও গভীর করেছিল।

‘‘এতে আপনি এমন একটি অবস্থানে আরও আটকে যান, যেখানে আসলে আপনি থাকতে চান না,’’ বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, মরিসন বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকে বিশ্বের অন্যান্য নেতাদের সামনে চীনের দেওয়া ১৪ দফা অভিযোগের তালিকাটি তুলে ধরেছিলেন।

ফ্লেচারের মতে, ২০২২ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির জয় দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘বিরতি’ তৈরি করে। এর ফলে উভয় পক্ষই মুখ রক্ষা করে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ পায়।

তবে এ জন্য অস্ট্রেলিয়া ও চীন উভয় পক্ষকেই কিছুটা সমঝোতা করতে হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ফ্লেচার বলেন, ‘‘আমাদের দিকেও এমন মানুষ ছিলেন, যারা জিততে চেয়েছিলেন। তারা চেয়েছিলেন চীনকে লজ্জিত, অপদস্থ ও পরাজিত করতে।’’

তাঁর মতে, চীনের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি যেমন বাস্তবসম্মত ছিল না, তেমনি অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকেও চীনকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার চেষ্টা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বাধা তৈরি করেছিল।

চীনের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও সরাসরি সমালোচনা করেছেন ফ্লেচার। তাঁর মতে, দেশটি ক্রমেই সংকীর্ণ রাজনৈতিক ও আদর্শিক চিন্তার মধ্যে আটকে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘‘উন্নয়ন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সমাজের বিষয়ে তারা নিজেদের চিন্তাকে একটি বেশ সংকীর্ণ পথে আটকে ফেলছে।’’

এর আগে বেইজিং মরিসন সরকারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। (এবিসি নিউজ: হ্যারিয়েট ট্যাথাম)

১৯৮০-এর দশকে প্রথমবার চীনে দায়িত্ব পালনের সময়কার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করেন ফ্লেচার। তাঁর ভাষ্য, সে সময় চীন অর্থনীতি উন্মুক্ত করছিল এবং দেশটির কর্মকর্তারা নতুন ধারণার প্রতি অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন। তারা বাইরের বিশ্বের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতেও আগ্রহ দেখাতেন।

তবে শি জিনপিংয়ের আমলে আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর নীতি ‘মূল্য দিতে হচ্ছে’ বলে মনে করেন তিনি।

ফ্লেচারের মতে, চীনের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সেই সাফল্য নিয়ে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি দেশটির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘‘নিজেদের অগ্রগতি নিয়ে এই সন্তুষ্টি, এমনকি আত্মতুষ্টি, তাদের বর্তমান অবস্থার প্রতি একটু বেশি সন্তুষ্ট করে তুলছে।’’

চীনের অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, দেশটির নিজেদের ধারণা ও নীতিকে নিয়মিতভাবে চ্যালেঞ্জ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফ্লেচারের ভাষায়, ‘‘তারা নিজেদের চিন্তায় আরও উন্মুক্ত হতে প্রস্তুত থাকলে আরও অনেক ভালো করতে পারত।’’

তাঁর মতে, চীনা সমাজ ও অর্থনীতিতে এখনও প্রাণশক্তি ও গতিশীলতা রয়েছে। তবে অতিরিক্ত আদর্শিক কঠোরতা দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ধীরে ধীরে চাপ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, ‘‘প্রচার ও আদর্শের ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়ার নেতিবাচক দিক হলো, এটি মানুষকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলে।’’

ফ্লেচারের মতে, সরকারি কর্মকর্তা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উদ্যোক্তারা এখন আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকি এড়িয়ে চলছেন। কারণ, সরকারের নির্ধারিত অবস্থান থেকে সরে গেলে কী ধরনের নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে, তা তারা বুঝতে পারছেন।

সূত্র:এবিসি নিউজ

এই শাখার আরও খবর

সরকার পরিবর্তনের পেছনে ছিল ইউনূস ও জাতিসংঘের ভূমিকা, ১,৪০০ নিহতের পরিচয় প্রকাশের দাবি

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জনের অভিযোগ তুলেছে একটি নিবন্ধ। এতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ইউনূস সেন্টার, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংস্থা এবং…

প্রধানমন্ত্রীর বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, জাপানের আটকে ফ্লাইট

যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিজি-৩৭৭-এর উড্ডয়ন বিলম্বিত হয়েছে। জাপানের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে…

তাওসিফকে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে, দাবি বাবার

বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাওসিফ সাউরীকে হত্যা করে তাঁর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাবা একেএম এনায়েতুল করিম। বৃহস্পতিবার (২৯…

ভিক্টোরিয়ায় ১২ বছর পর লেবার সরকারের পতনের আভাস, জরিপে এগিয়ে কোয়ালিশন

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকা লেবার পার্টির সরকারের অবসানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। নতুন এক জনমত জরিপে বিরোধী দলীয় নেতা জেস উইলসনের নেতৃত্বাধীন…

ইসরায়েলের নির্বাচনে কাতারের প্রভাবের অভিযোগ, তদন্তের নির্দেশ নির্বাচন কমিটির প্রধানের

ইসরায়েলের নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্ত করতে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেটকে নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির প্রধান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ। কাতারের অর্থায়নে আরব…

সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে জাতিসংঘের ফোরামের অধিবেশন ২৬-২৭ নভেম্বর

সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা ও অগ্রগতিতে আঞ্চলিক উদ্যোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে আগামী ২৬ ও ২৭ নভেম্বর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের সংখ্যালঘু বিষয়ক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au