ব্লাস্ট ফার্নেস বন্ধ, চাকরি হারাবেন ৫০০-এর বেশি কর্মী
অস্ট্রেলিয়ার সাউথ অস্ট্রেলিয়া অঙ্গরাজ্যের ওয়াইয়ালা স্টিলওয়ার্কসের ব্লাস্ট ফার্নেস বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কারখানাটির ৫০০ জনের বেশি কর্মী চাকরি হারাতে পারেন। লোহা আকরিককে ইস্পাতে…
কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত ৪৭ জন মুসলিম পুলিশ সদস্যের দাড়ি রাখার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ। চাকরিতে বহাল থাকতে হলে তাঁদের দাড়ি কামিয়ে ফেলতে হবে বলে জানানো হয়েছে। বাহিনীতে শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও সদস্যদের চেহারায় একরূপতা বজায় রাখার যুক্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কলকাতা পুলিশ।
গত ৪ সেপ্টেম্বর কলকাতা পুলিশ কমিশনারের কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশিকা বা স্মারকপত্র জারি করা হয়। এতে বাহিনীর প্রচলিত দাড়িসংক্রান্ত পোশাকবিধি কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুগ্ম কমিশনার (সদর দপ্তর) স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশিকায় দাড়ি রাখার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা ৪৭ জন মুসলিম পুলিশ সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দেশিকায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে জানিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাহিনীর সব বিভাগীয় প্রধানকে বিষয়টি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, অনুমতি ছাড়া দাড়ি রাখা যাবে না এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যদের প্রচলিত পোশাকবিধি অনুযায়ী দাড়ি কামিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
কলকাতার একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের একাংশ মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছেন। তাঁদের অনেকেই ধর্মীয় কারণে দাড়ি রেখেছিলেন। স্থানীয় সংবাদপত্র ‘পুবের কলম’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হজ পালন করে ফিরে সুন্নাহ অনুসরণের অংশ হিসেবে দাড়ি রেখেছিলেন।
কলকাতা পুলিশের এই সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর ভারতের পুলিশ বাহিনীতে ধর্মীয় স্বাধীনতা, পোশাকবিধি এবং বাহিনীর শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে, ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ হিসেবে দাড়ি রাখার বিষয়টি একজন মুসলিম পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে কি না এবং বাহিনীর অভিন্ন পোশাক ও চেহারার নীতির কারণে সেই অধিকার কতটা সীমিত করা যেতে পারে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ বাহিনীতে সাধারণভাবে সরকারি অনুমতি ছাড়া পুলিশ সদস্যদের দাড়ি রাখার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে শিখ ধর্মাবলম্বী পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রে পাগড়ি, দীর্ঘ চুল ও দাড়ি রাখার অনুমতি রয়েছে। ফলে মুসলিম পুলিশ সদস্যদের জন্য একই ধরনের ধর্মীয় ছাড় কেন প্রযোজ্য হবে না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আইন ও পুলিশি বিধির বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ালেও মুসলিম পুলিশ সদস্যদের পক্ষে আইনি লড়াই সহজ নাও হতে পারে। এর অন্যতম কারণ ভারতের বিভিন্ন পুলিশ বাহিনীর প্রচলিত ম্যানুয়াল ও আদালতের আগের কিছু রায়।
পুলিশি পোশাকবিধির ইতিহাসও এ বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় পুলিশ বাহিনীর অনেক প্রচলিত বিধিবিধানের শিকড় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। সে সময় পুলিশ ও সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা, অভিন্ন পোশাক এবং সদস্যদের বাহ্যিক চেহারায় একরূপতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। সেই ধারাবাহিকতায় অনেক বাহিনীতে দাড়ি রাখার ওপর বিধিনিষেধ তৈরি হয়।
তবে একই সময় শিখ সম্প্রদায়ের সদস্যদের ধর্মীয় রীতিনীতি বিবেচনায় রেখে দাড়ি ও চুল রাখার বিষয়ে বিশেষ ব্যতিক্রমও তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন পুলিশ বাহিনীর পোশাক ও আচরণবিধিতে সেই ব্যতিক্রম বহাল রয়েছে।
কলকাতা পুলিশের বর্তমান সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০২০ সালের উত্তর প্রদেশের একটি ঘটনা। ওই সময় লক্ষ্ণৌ পুলিশের মহাপরিচালক পুলিশ সদস্যদের দাড়ি কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে এক মুসলিম কনস্টেবলকে বরখাস্ত করা হয়। পরে তিনি সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে থাকা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্ম পালনের অধিকারের কথা উল্লেখ করে আদালতের দ্বারস্থ হন।
তবে এলাহাবাদ হাইকোর্টের লক্ষ্ণৌ বেঞ্চ ওই পুলিশ সদস্যের পক্ষে রায় দেয়নি। আদালত দাড়ি রাখাকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ বাহিনীর সরকারি নির্দেশ ও পোশাকবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পুলিশের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক এবং দাড়ি রাখার বিষয়টি সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে এমনভাবে সুরক্ষিত নয় যে পুলিশি পোশাকবিধি তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
এই রায়ের কারণে কলকাতা পুলিশের ৪৭ মুসলিম কর্মীর ক্ষেত্রেও আদালতে গিয়ে একই ধরনের আবেদন করলে তাঁদের পক্ষে আইনি সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে পশ্চিমবঙ্গে অতীতে পুলিশ সদস্যদের দাড়ি রাখার বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে পুলিশ সদস্যদের ধর্মীয় অনুশীলনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কঠোর আপত্তি দেখা যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মুসলিম পুলিশ সদস্যরা দাড়ি রাখতে পারেন।
এবারের নির্দেশিকায় সেই অবস্থান থেকে পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে কলকাতা পুলিশের পুরোনো পোশাকবিধিকে নতুন করে কঠোরভাবে প্রয়োগের কারণ কী, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলকাতা পুলিশের কয়েকজন মুসলিম কর্মী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নির্দেশিকাটি তাঁদের জন্য কষ্টের হলেও তাঁরা আপাতত আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা ভাবছেন না। চাকরি হারানোর ঝুঁকি এড়াতে তাঁরা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে দাড়ি রেখেছেন। ফলে হঠাৎ করে তা কেটে ফেলার নির্দেশ তাঁদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। তবে পুলিশের চাকরিতে থাকা এবং চাকরি হারানোর ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াইয়ে যেতে অনিচ্ছুক।
কলকাতা পুলিশের এই সিদ্ধান্ত এখন মূলত দুটি প্রশ্নকে সামনে এনেছে। একদিকে রয়েছে বাহিনীর শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও অভিন্ন চেহারা বজায় রাখার যুক্তি। অন্যদিকে রয়েছে একজন পুলিশ সদস্যের ধর্মীয় বিশ্বাস ও তা পালনের অধিকার। ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার স্বীকার করলেও সরকারি চাকরি ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীতে সেই অধিকার প্রয়োগের সীমা কতটা, তা নিয়ে দেশটির আদালতে অতীতেও বিতর্ক হয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au