ইউপিআই মাশুলে তীব্র বিতর্ক, ট্রাম্পের চাপের অভিযোগ রাহুলের
ভারতে ২ হাজার রুপির বেশি নির্দিষ্ট ইউপিআই ব্যবসায়িক লেনদেনে মাশুল আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী…
বাংলাদেশের শহরগুলোতে সূর্য ডোবার পরও বাড়ছে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার। আর এর মধ্যেই ডেঙ্গুর জীবাণু ছড়ানো এডিস মশার আচরণ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন গবেষকরা। দিনের মশা হিসেবে পরিচিত এডিস মশা অন্ধকার নামার পরও সক্রিয় থাকছে বলে বাংলাদেশের গবেষণায় উঠে এসেছে।
সাধারণভাবে এডিস মশাকে দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে বেশি কামড়ানো মশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, সূর্যাস্তের পরও এ মশা মানুষের আশপাশে সক্রিয় থাকে।
বিদেশে পরিচালিত গবেষণাতেও দেখা গেছে, রাতে কৃত্রিম আলো মশার চলাচল ও কামড়ানোর সময় বাড়াতে বা দীর্ঘায়িত করতে পারে।
এতে বাংলাদেশের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: শহরগুলোতে রাত যত বেশি আলোকিত হচ্ছে, তত কি এডিস মশার মানুষের সংস্পর্শে আসার সময়ও বাড়ছে?
তবে এখন পর্যন্ত ঢাকার এলইডি স্ট্রিটলাইট বা অন্য কোনো কৃত্রিম আলোর কারণে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ছে, এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। গবেষকরা বলছেন, এ ধরনের সম্পর্ক নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম আলোর মাত্রা ও ধরন অনুযায়ী এডিস মশার আচরণ নিয়ে নির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন।
ডেঙ্গুর আরেকটি তীব্র মৌসুমে, যখন ঢাকার বাইরেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন বিষয়টি নিয়ে গবেষণার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন ধরে এডিস মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, রাতের বেলায় এডিস মশার সক্রিয়তার বিষয়টি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, রাতে এডিস মশার ঘনত্ব কিছুটা কম থাকলেও তারা এ সময়ও মানুষকে কামড়ায়।
অধ্যাপক বাশারের ভাষ্য, আগে এডিস মশাকে মূলত দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে কামড়াতে দেখা যেত।
বাশার ও তাঁর সহকর্মীরা ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে মোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯০৪টি মশা সংগ্রহ করেন।
বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা দেখতে পান, এডিস মশা সন্ধ্যার পরও সক্রিয় থাকে। এমনকি রাত ৯টার দিকেও তাদের সক্রিয়তা পাওয়া গেছে।
তবে এই গবেষণায় কৃত্রিম আলোর মাত্রার ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকার এডিস মশার আচরণের তুলনা করা হয়নি। ফলে রাতের আলোর কারণে এডিস মশা বেশি সময় সক্রিয় থাকছে কি না, তা এই গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এদিকে ঢাকার রাতের পরিবেশ গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে।
২০২৬ সালে Environmental Sciences Europe জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত VIIRS স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঢাকায় কৃত্রিম রাতের আলোর বিস্তার তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, নগরীতে রাতের আলোর পরিমাণ বছরে গড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে বেড়েছে।
শহরের বিমানবন্দর, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও তেজগাঁও এলাকায় তুলনামূলক বেশি আলোকিত এলাকা চিহ্নিত হয়েছে।
ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরেও পুরোনো স্ট্রিটলাইটের জায়গায় অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল সাদা এলইডি বাতি বসানো হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক এলাকা, ভবন ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থল রাত পর্যন্ত আলোকিত থাকছে।
তবে স্যাটেলাইটের তথ্য শুধু শহরে রাতের কৃত্রিম আলোর বিস্তার দেখিয়েছে। এর সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের কোনো সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেনি।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় কৃত্রিম আলোর সঙ্গে মশার রাতের সক্রিয়তার একটি সম্ভাব্য জৈবিক সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
২০২০ সালের একটি গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা যায়, স্বাভাবিক পরীক্ষামূলক পরিবেশে স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশার ৮২ শতাংশ দিনের বেলায় রক্ত পান করেছিল। রাতে এই হার ছিল ২৯ শতাংশ।
কিন্তু মশাগুলোকে ৩০ মিনিট সাদা আলোর সংস্পর্শে রাখার পর রাতে রক্ত পান করার হার বেড়ে ৫৯ শতাংশে পৌঁছায়।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির ওপর পরিচালিত একটি মাঠপর্যায়ের গবেষণাতেও কৃত্রিম আলোর প্রভাবের সম্ভাব্য ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ৫৮টি স্থানে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, যেসব এলাকায় কৃত্রিম আলোর দূষণ বেশি, সেখানে রাতে মশার সক্রিয়তাও বেশি ছিল। বিশেষ করে অতিরিক্ত গরম দিনের পর এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
তবে এসব গবেষণার ফল সরাসরি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। কারণ মশার প্রজাতি, আবহাওয়া, পরিবেশ এবং বাস্তবে ব্যবহৃত আলোর ধরন ও মাত্রার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন রেজা খান বলেন, এসব সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণা করা জরুরি।
তাঁর মতে, রাতে কৃত্রিম আলো প্রাণীর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোন প্রজাতির ওপর কী ধরনের এবং কতটা প্রভাব পড়বে, তা প্রজাতিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কোনো প্রাণী বা মশার প্রজাতির ওপর আলোকদূষণের প্রভাব সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে হলে লক্ষ্যভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণায় কাছাকাছি পরিবেশের এমন কয়েকটি এলাকা নির্বাচন করা যেতে পারে, যেখানে কৃত্রিম আলোর মাত্রা ও ধরন ভিন্ন। সেখানে এডিস মশার সক্রিয়তার পাশাপাশি আলোর উজ্জ্বলতা, আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, রঙের তাপমাত্রা, কতক্ষণ আলো জ্বলছে এবং রাতের তাপমাত্রার মতো বিষয়ও পরিমাপ করতে হবে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার দিনের বেলার আচরণ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যার পরও এ মশার সক্রিয় থাকার প্রমাণ সেই ধারণাকে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন তৈরি করছে।
এখন পর্যন্ত রাতের কৃত্রিম আলোকে বাংলাদেশের ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী করার মতো সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে শহরগুলো যখন সূর্যাস্তের পরও দীর্ঘ সময় জেগে থাকে এবং কৃত্রিম আলোয় আলোকিত থাকে, তখন এডিস মশার মানুষের সংস্পর্শে আসার সময়ও একই সঙ্গে বাড়ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে বাংলাদেশেই আলো, মশার আচরণ এবং ডেঙ্গু সংক্রমণের সম্পর্ক নিয়ে আরও নির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au