মিরপুরে চলন্ত যাত্রীবাহী বাসে আগুন
ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরে চলন্ত একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জমজম টাওয়ারের পাশে শিকড় পরিবহনের একটি বাসে এ আগুন লাগে।…
খুলনায় মেসে ‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অভিযোগে মো. আজমুল হোসেন (২১) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার রাতে নগরীর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের একটি ছাত্র মেসে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আজমুল হোসেন বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তি হন। তাঁর বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের কুতুব উদ্দিন ও আসমা বেগমের ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মেসের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসলামনগর রোডের চারতলা ভবনটি পুরোপুরি ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকেন। প্রায় এক বছর আগে আজমুল ওই ভবনের চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। চারতলায় মোট আটটি কক্ষ রয়েছে। ডি-২ নম্বর কক্ষে থাকেন মেসের ম্যানেজার মেহেদী, যিনি গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।
মেসের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্থানীয়রা জানতে পারেন, শুক্রবার রাতে মেহেদীর রাখা ভাত আজমুল খেয়ে ফেলেন। এরপর ‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অভিযোগে মেহেদীসহ মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও কয়েকজন বহিরাগত আজমুলকে ছাদে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতের কোনো একসময় ছাদ থেকে ভারী কিছু নিচে পড়ে যাওয়ার মতো শব্দ শোনা যায়। পরে তাঁরা গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখেন। মেসের শিক্ষার্থীরা তাঁকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, আজমুলের মৃত্যুর খবর জানার পর মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী জরুরি বিভাগের সামনে থেকে দ্রুত চলে যান। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, আজমুলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাঁর দুই পা ভাঙা ছিল।
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই মেসে গিয়ে দেখা যায়, চারতলার আটটি কক্ষের মধ্যে সাতটিই তালাবদ্ধ। এর মধ্যে ডি-৮ নম্বর কক্ষটি ছিল আজমুলের। ডি-১ নম্বর কক্ষে গিয়ে নক করলে বেরিয়ে আসেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লাবিব বিশ্বাস রাসেল।
লাবিব বিশ্বাস রাসেল বলেন, চুরির অভিযোগে মেহেদীসহ কয়েকজন আজমুলকে ছাদে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয়। তবে কীভাবে আজমুলের মৃত্যু হয়েছে, তা তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
মেসটির ছাদে গিয়ে দেখা যায়, এক পাশে অনেক মানুষের চলাচলের কারণে ধুলাবালি জমে থাকা এবং ছাদের কিছু অংশের আস্তরণ উঠে যাওয়ার মতো চিহ্ন রয়েছে। তবে এসব চিহ্ন কীভাবে তৈরি হয়েছে বা আজমুলের মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মেসের বুয়া ফাতেমা বলেন, আজমুলের বিরুদ্ধে এর আগেও টাকা ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ উঠেছিল। শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেসের শিক্ষার্থী ও বহিরাগত কয়েকজন তাঁকে মারধর করেন। তিনি তাঁদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁরা তাঁর কথা শোনেননি বলে দাবি করেন ফাতেমা। পরে তিনি আজমুলের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
মেসের পেছনের একটি ভবনের এক নারী বাসিন্দা জানান, শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি হঠাৎ জোরে একটি শব্দ শুনতে পান। এরপর দরজা খুলে বাইরে এসে বাড়ির সামনে গলিতে একটি ছেলেকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে মেসের শিক্ষার্থীরা অ্যাম্বুলেন্স এনে ওই তরুণকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এদিকে ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে শনিবার দুপুরে হরিণটানা থানায় যান আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন। দুপুর দেড়টার দিকে থানায় গিয়ে দেখা যায়, তিনি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের সামনে বসে আছেন। পেছনের বেঞ্চে নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন আজমুলের মা চল্লিশোর্ধ আসমা বেগম।
কুতুব উদ্দিন জানান, তাঁর দুই ছেলে। আজমুল বড়। প্রায় এক বছর আগে পড়াশোনার জন্য সে বাড়ি থেকে খুলনায় আসে। গত বছর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। মাত্র ১০ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর সে বাড়িতে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে খুলনার উদ্দেশে রওনা হয় আজমুল। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনায় পৌঁছায়। রাত ৯টার দিকে পরিবারের সঙ্গে ফোনে তাঁর শেষ কথা হয়।
কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘তখন সে বলেছিল, আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।’
এরপর রাত ১২টার পর আজমুলের মোবাইল ফোন থেকে অন্য একজন ফোন করেন বলে দাবি করেন তিনি। কুতুব উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি তাঁকে বলেন, তাঁর ছেলে ‘ঝামেলা’ করেছে এবং তাকে পেতে হলে দ্রুত এক লাখ টাকা নিয়ে আসতে হবে। টাকা না আনলে ছেলেকে পাওয়া যাবে না বলেও ওই ব্যক্তি জানান।
কুতুব উদ্দিন বলেন, তিনি ওই ব্যক্তিকে জানান, তাঁরা গরিব মানুষ, এক লাখ টাকা কোথা থেকে পাবেন। তখন ওই ব্যক্তি তাঁকে কী করেন জানতে চান। তিনি কৃষিকাজ করেন জানালে দ্রুত খুলনায় আসতে বলা হয়। তিনি ট্রেনে আসার কথা জানালে ওই ব্যক্তি বলেন, তিনি ট্রেনে, বাসে নাকি বিমানে আসবেন, সেটা তাঁর বিষয়।
কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘তারপর সকালে এসে দেখি, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।’
থানায় পুলিশের কর্মকর্তাদের সামনে ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন কুতুব উদ্দিন। তিনি বলেন, ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরেছে, এ কারণে তাঁরা খুব খুশি ছিলেন। শুক্রবার রাত ৯টায় যে ছেলে ফোন করে বলেছিল সে ভালো আছে, তাঁকে নিয়ে চিন্তা না করতে, সেই ছেলেকেই অন্য শিক্ষার্থীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘আমি কার কাছে বিচার দেব? আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আমরা বিচার পাব না। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। আল্লাহই বিচার করবে।’
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। নিহত আজমুলের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনগতভাবে যা যা করা যায়, আমরা তাই করব।’
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কানাই লাল সরকার জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ভর্তি হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এই ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁর সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আজমুলের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছে এবং তাঁদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের পাশে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের তদন্তে এখন মূলত কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। আজমুলকে কারা মেসের ছাদে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল, তাঁকে কী ধরনের মারধর করা হয়েছিল, ছাদ থেকে তিনি পড়ে গিয়েছিলেন কি না এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে মেসের শিক্ষার্থী বা বহিরাগত কারও সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিহতের মোবাইল ফোন থেকে এক লাখ টাকা চাওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এদিকে খুলনা নগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনিতে মৃত্যুর আরও দুটি ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গত ১৭ আগস্ট শিশু অপহরণকারী সন্দেহে মো. রাজু (২৬) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরে ৫ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর কুয়েট রোডে চুরির অভিযোগে সাজমীর (২৪) নামে আরেক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাটি সত্যিই গণপিটুনি, পরিকল্পিত মারধর নাকি ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে মৃত্যু, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ‘ভাত চুরি’ করার অভিযোগের মতো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের ভূমিকা নির্ধারণ এখন পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au