২০ সেপ্টেম্বর ‘ঢাকা লকডাউন’, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের কাউন্টডাউন শুরু
রাজধানী ঢাকায় আগামীকাল রোববার ‘লকডাউন’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগী সংগঠন যুবলীগ। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর দিনব্যাপী এ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।…
সুন্দর ও স্বচ্ছল জীবনের আশায় প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি নারী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ গৃহকর্মী হিসেবে বিভিন্ন দেশে গেলেও বিদেশ যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, কর্মপরিবেশ, চাকরির চুক্তি এবং নিয়োগকর্তা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় অনেকেই গন্তব্য দেশে গিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং গৃহবন্দি করে রাখার মতো অভিযোগ রয়েছে তাঁদের অনেকের।
কেউ কেউ আবার জীবিকার সন্ধানে বিদেশে গিয়ে আর জীবিত ফিরতে পারছেন না। দেশে ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে।
সংসদে দেওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে শত শত নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের হিসাবে, ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। অর্থাৎ এই সময়ের হিসাবে বছরে গড়ে ৮২ জনের বেশি নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে। বিভিন্ন সময়ের আট বছরের হিসাব ধরলে গড়ে বছরে প্রায় ১০০ নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফেরার চিত্র পাওয়া যায়।
এর মধ্যে ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব আত্মহত্যার বড় অংশই সৌদি আরবে ঘটেছে।
অন্যদিকে, বিদেশে নারী শ্রমিকের যাওয়া অব্যাহত থাকলেও তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন বাংলাদেশি নারী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬১ হাজার ১৫৮। অর্থাৎ এক বছরে নারী কর্মীর বিদেশযাত্রা ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নারী অভিবাসন প্রায় ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।
এর আগে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর এক লাখের বেশি বাংলাদেশি নারী বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। করোনাভাইরাস মহামারির সময় এই প্রবাহ কমে গেলেও ২০২২ সালে আবার এক লাখ ছাড়ায়। এরপর থেকে নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রা আবার কমতে শুরু করে।
সংসদে দেওয়া তথ্যে বিরোধীদলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। তাঁদের অনেকেই বিদেশে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বঞ্চনা ও চাকরির চুক্তি লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি ২৪ ঘণ্টার কার্যকর হটলাইন, সেফ হোম, বীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তার তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানান।
জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রবাসী কর্মীদের অভিযোগ ও জরুরি সহায়তার জন্য ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। বিদেশে থাকা কর্মীরাও এই নম্বরে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশি দূতাবাস বা মিশনের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন গবেষণায় নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম ওকাপের এক গবেষণায় দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশ নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ৯৭ শতাংশ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং একই সংখ্যক নারী জানিয়েছেন, তাঁরা নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি পাননি। এছাড়া ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়েছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, অনেক নারী পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রাম থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। কারও কারও ক্ষেত্রে তাঁদের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং কর্মস্থল থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এসব পরিস্থিতিতে অনেক নারী অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর অনেক নারী দেশে ফিরলেও তাঁদের জন্য পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা ও ন্যায্য পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো গন্তব্য দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ নারী বিদেশে গেলেও তাঁদের বড় অংশ নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিশেষ করে সৌদি আরব ও জর্ডান নারী কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। অন্যদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন নতুন শ্রমবাজারেও নারী কর্মীদের যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যদিও এসব দেশে নারী কর্মীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিদেশে পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো নয়, নারী শ্রমিকদের দক্ষতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে পাঠানোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নারীদের জন্য বিকল্প পেশার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সীমা জহুর বলেন, নারী শ্রমিকরা বিদেশে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু তাঁদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে এখনও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। দালালদের প্রলোভনে পড়ে অনেক নারী বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ, বেতন ও কর্মপরিবেশ পান না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে নারী কর্মীদের গন্তব্য দেশের ভাষা, কাজের দক্ষতা, শ্রম অধিকার ও আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তা ও চাকরির চুক্তিপত্র যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তাঁর মতে, নারী কর্মীদের শুধু গৃহকর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নার্সিং, পরিচর্যা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক পেশায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন তাঁদের কর্মক্ষেত্রের বৈচিত্র্য বাড়বে, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত ও দক্ষ শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে হলে বিদেশ যাওয়ার আগের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে গন্তব্য দেশে কর্মপরিবেশ পর্যবেক্ষণ, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, দূতাবাসের কার্যকর সহায়তা, আইনি সুরক্ষা এবং দেশে ফেরার পর পুনর্বাসন পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে হবে। অন্যথায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের জীবন ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি অমীমাংসিতই থেকে যাবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au