বাংলাদেশ

ইসলামি বইমেলায় আল-কায়েদা নেতাদের বই, বাংলাদেশের জন্য বাড়ছে উগ্রপন্থার ঝুঁকি

  • 12:40 am - September 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৩ বার
ইসলামি বইমেলায় আল-কায়েদা নেতাদের বই। ছবিঃ সংগৃহীত

ইসলামি বইমেলায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নেতাদের লেখা এবং তাঁদের মতাদর্শ প্রচারকারী একাধিক বই। শুধু মেলা নয়, বাংলাবাজারের বিভিন্ন প্রকাশনী, অনলাইন বইয়ের বাজার, ই-বুক স্টোর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব বইয়ের প্রচার ও বিক্রি চলছে। অনুসন্ধানে এমন বহু বইয়ের সন্ধান মিলেছে, যেগুলোর লেখক হিসেবে রয়েছেন আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন, সংগঠনটির সাবেক প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরি, আল-কায়েদার আধ্যাত্মিক গুরু আবদুল্লাহ আযযাম, আনোয়ার আল-আওলাকি, আহমাদ মুসা জিবরিলসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও উগ্রবাদ নিয়ে গবেষকদের মতে, কোনো সন্ত্রাসী বা উগ্রপন্থী সংগঠনের নেতাদের মতাদর্শ ও বক্তব্য যখন অনুবাদ করে সহজলভ্য করা হয়, তখন তা শুধু একটি বই বিক্রির বিষয় থাকে না। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এসব মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হলে তা দীর্ঘমেয়াদে উগ্রপন্থা বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে প্রকাশনা ও বিপণনের ক্ষেত্রে লেখক, বিষয়বস্তু ও মতাদর্শগত অবস্থান যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

গত ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব চত্বরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাসব্যাপী ইসলামি বইমেলা উদ্বোধন করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। মেলা ঘুরে দেখা যায়, ডজনখানেক প্রকাশনীতে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত বা সংগঠনটির মতাদর্শ প্রচারের জন্য পরিচিত নেতাদের বই বিক্রি হচ্ছে। এসব বইয়ের বেশ কিছু বাংলা ভাষায় অনূদিত। একই বই বিভিন্ন প্রকাশনী ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও পাওয়া যাচ্ছে।

সন্ত্রাসী নেতাদের বই ঘিরে প্রশ্ন

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে আল-কায়েদা। বাংলাদেশেও সংগঠনটির ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা আনসার আল-ইসলাম নিষিদ্ধ। এমন একটি সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের লেখা বই কীভাবে দেশের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত বইমেলায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাফী মো. মোস্তফা দীর্ঘদিন ধরে উগ্রবাদ নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, যেসব লেখক বৈশ্বিক সন্ত্রাসী তালিকায় রয়েছেন এবং যাঁদের উগ্রবাদ ছড়ানোর ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের লেখা বই বিক্রির ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকেই যায়।

তিনি বলেন, এসব বই বাজারজাত করার আগে সঠিক যাচাই-বাছাই থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, উগ্রবাদ এখন বৈশ্বিক সমস্যা এবং এটি মোকাবিলায় সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি ও স্থায়ী কাঠামো প্রয়োজন।

মেলার আয়োজকদের বক্তব্য

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী জানিয়েছেন, আল-কায়েদা নেতাদের বই মেলায় বিক্রি হচ্ছে, এমন তথ্য আগে তাঁদের কাছে ছিল না। তিনি বলেন, মেলায় প্রকাশকদের অংশগ্রহণ ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে হয়েছে। আলেম-উলামারা যদি বইগুলোকে আল-কায়েদার বই হিসেবে শনাক্ত করেন, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, বইয়ের মাধ্যমে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হয় এমন কোনো কার্যক্রম তারা সমর্থন করেন না।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেলার বাইরেও একই ধরনের বই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে বাজারজাত হচ্ছে। ফলে বিষয়টি শুধু একটি বইমেলার স্টল কিংবা কয়েকটি প্রকাশনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রকাশনা, অনলাইন বিপণন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার এবং পাঠকদের কাছে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ‘রেকমেন্ডেশন’ পৌঁছে দেওয়ার একটি বিস্তৃত ব্যবস্থা।

আল-কায়েদার শীর্ষ নেতাদের বইয়ের বিস্তার

আল-কায়েদার আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে পরিচিত আবদুল্লাহ আযযাম, সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন এবং সাবেক প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরির বিভিন্ন লেখা ও বক্তব্য বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংগঠনটির বিভিন্ন শাখার নেতাদের বইও পাওয়া যাচ্ছে।

রুহামা পাবলিকেশন্সের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে যে তারা আল-কায়েদার শীর্ষস্থানীয় নেতা খালিদ আল হুসাইনান ওরফে আবু জায়েদ আল-কুয়েতির একাধিক বই প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক রফিকুল ইসলাম অবশ্য বলেছেন, বইগুলো পুরোনো এবং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনুবাদ করা হয়েছিল। তিনি স্বীকার করেছেন, এসব বই তাঁদের প্রকাশনায় রয়েছে এবং মেলাতেও বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীতে ইসলামি বইমেলায় পাঠকের ভিড়। ছবি: ফোকাস বাংলা

আর-রিহাব, শব্দতরু, চেতনা, ইলমওয়েব, ইলমহাউস, খান প্রকাশনীসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামও অনুসন্ধানে এসেছে। এসব প্রকাশনীতে ওসামা বিন লাদেন, আয়মান আল-জাওয়াহিরি, আনোয়ার আল-আওলাকি, আহমাদ মুসা জিবরিল, আসিম আল বারকাওয়ী, আসেম ওমরসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বই পাওয়া গেছে।

তরুণদের ঘিরেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ

উগ্রপন্থী বইয়ের বাজার নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে তরুণ পাঠক। ইসলামি ধারার বইয়ের বড় একটি অংশের পাঠক তরুণ হওয়ায় উগ্রপন্থী মতাদর্শের বই সহজলভ্য হলে তাদের একটি অংশ এসব মতাদর্শের সংস্পর্শে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লেখক সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর বলেন, তরুণ বয়স আবেগ ও কল্পনাপ্রবণতার সময়। এ কারণে উগ্রপন্থী বইয়ের সঙ্গে সহজে পরিচিত হলে কারও কারও মধ্যে কঠোর মতাদর্শ তৈরি হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত বা প্রভাবশালী ধর্মীয় বক্তাদের প্রচারণা এ ক্ষেত্রে বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাঁর মতে, কোনো কোনো তরুণ এসব ব্যক্তির বক্তব্যকে ধর্মের ‘অকাট্য বাণী’ হিসেবে গ্রহণ করেন। এর ফলে ভিন্নমত, সাহিত্য ও সৃজনশীল চিন্তার জায়গা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

শুধু বই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রকাশনী তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ ব্যবহার করে এসব বইয়ের প্রচারণা চালাচ্ছে। কোথাও নির্দিষ্ট ধর্মীয় বক্তার ‘হাইলি রেকমেন্ডেড’ বই হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, কোথাও আবার পরিচিত ব্যক্তিদের পছন্দের বই হিসেবে পাঠকদের সংগ্রহ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

আর-রিহাব পাবলিকেশন্সের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসেম ওমরের একটি বইয়ের প্রচারে একজন ধর্মীয় ব্যক্তির সুপারিশের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্য পোস্টে আসিফ আদনান ও মুফতি হারুন ইজহারকে ঘিরেও বইয়ের সুপারিশের প্রচারণা দেখা গেছে।

এ ধরনের প্রচারণা বইয়ের সাধারণ বিজ্ঞাপনের চেয়ে আলাদা মাত্রা তৈরি করতে পারে। কারণ পরিচিত বক্তা বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নাম যুক্ত হলে পাঠকের একটি অংশ বইটিকে মতাদর্শগতভাবে গ্রহণযোগ্য বা নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

উগ্রপন্থার ঝুঁকি শুধু আইনশৃঙ্খলায় সীমাবদ্ধ নয়

উগ্রপন্থার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় সাধারণত সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু গবেষকদের মতে, উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তার এর চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

একটি মতাদর্শ যখন নিয়মিতভাবে বই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বক্তৃতা ও অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের চিন্তা ও সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। এর সঙ্গে যদি সহিংসতা বা সশস্ত্র সংগ্রামকে বৈধতা দেওয়ার ধারণা যুক্ত থাকে, তাহলে বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাফী মো. মোস্তফার ভাষায়, উগ্রবাদকে সমস্যা হিসেবে স্বীকার করাই প্রথম ধাপ। এরপর এটি মোকাবিলায় স্থায়ী কাঠামো প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিভিন্ন ঘরানার আলেম, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বোর্ড বা কমিটি গঠন করে উগ্রবাদ মোকাবিলার দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।

অতীতে উগ্রবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার প্রকাশকরাও ছিলেন

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উগ্রপন্থী মতাদর্শের বই প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা বা গ্রেপ্তারের ঘটনাও রয়েছে।

আর-রিহাবের প্রকাশক ও মালিক হাবিবুর রহমান ওরফে শামীমকে ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাবাজার থেকে এন্টি টেরোরিজম ইউনিট গ্রেপ্তার করে। পুলিশ পরে তাঁকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করে এবং উগ্রবাদ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বই প্রকাশ ও বিক্রির অভিযোগের কথা জানায়।

তবে পরবর্তীতে হাবিবুর রহমান দাবি করেছেন, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি আগের কিছু বই বিক্রি ও প্রচার বন্ধ করেছেন। নির্দিষ্ট কয়েকটি বই সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, সেগুলো বর্তমানে আর-রিহাব প্রকাশ বা বিক্রি করছে না।

খান প্রকাশনীর মালিক মাওলানা ইসহাক খানের বিরুদ্ধেও ২০১৮ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পৃথক মামলা হয়েছিল এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। র‌্যাবের তৎকালীন বক্তব্যে তাঁকে আনসার আল ইসলামের ‘আধ্যাত্মিক নেতা’ মুহাম্মদ জসীমুদ্দীন রাহমানীর অনুসারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ইসহাক খান অবশ্য আল-কায়েদা বা কোনো সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অনলাইন বাজারেও সহজলভ্য

মেলার বাইরে বাতিঘর, রকমারি, ওয়াফিলাইফ, কিতাবঘর, রুহামাশপ, হালালপণ্য, নাফিউন, খিদমাহশপ, মামুন বুকসসহ বিভিন্ন অনলাইন ও ই-বুক প্ল্যাটফর্মে এসব বই পাওয়া যাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

রকমারির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকাশকের প্যানেল থেকেই বইয়ের তথ্য ও বিবরণ তাদের ওয়েবসাইটে যুক্ত করা হয়। বছরে বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশিত হওয়ায় প্রতিটি বইয়ের বিষয়বস্তু ম্যানুয়ালি যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো বই নিয়ে অভিযোগ এলে তারা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ওয়াফিলাইফের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, প্রকাশকদের প্যানেল থেকেই বইয়ের তথ্য আসে।

বাতিঘরের মালিক দীপঙ্কর দাসও বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ বইয়ের দোকান হিসেবে বিভিন্ন ধরনের বই রাখে। তবে কোনো বই উগ্রপন্থাকে সমর্থন করে বা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বলে জানা গেলে তা বিক্রি না করার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের বইয়ের বিষয়ে সরকারের আরও সচেতনতা প্রয়োজন।

যাচাই ছাড়া প্রকাশনা বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশে ধর্মীয় বইয়ের বিশাল বাজার রয়েছে। এই বাজারে উগ্রপন্থী মতাদর্শের বই প্রবেশের বিষয়টি শুধু প্রকাশক বা বিক্রেতার দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রকাশনা নীতিমালা, বইয়ের বিষয়বস্তু যাচাই, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, কোনো বই আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়, মানুষের স্বাধীন জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত করে বা সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে, তাহলে রাষ্ট্রের ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে।

জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সাবেক সদস্যসচিব নজরুল ইসলাম তালুকদারও মনে করেন, উগ্রপন্থী নেতাদের বই প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রয়োজন স্পষ্ট নীতি ও স্থায়ী কাঠামো

উগ্রপন্থী বই নিষিদ্ধ করা বা বিক্রি বন্ধ করার প্রশ্নের পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কোন ধরনের বই উগ্রবাদ প্রচার করে এবং কোনটি কেবল ধর্মীয়, ঐতিহাসিক বা গবেষণামূলক আলোচনার অংশ, তা নির্ধারণের জন্য কী ধরনের নীতিমালা থাকবে।

কারণ কোনো লেখকের বই প্রকাশিত হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধমূলক হয়ে যায় না। একইভাবে কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতার লেখা বইকে শুধু ধর্মীয় বই হিসেবে বাজারজাত করাও বিষয়টির পুরো প্রেক্ষাপটকে আড়াল করতে পারে। তাই লেখকের পরিচয়, সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক, বইয়ের বক্তব্য, সহিংসতার প্রতি অবস্থান, পাঠকের কাছে বইটি কীভাবে প্রচার করা হচ্ছে এবং বইটি উগ্রবাদে উৎসাহ দিচ্ছে কি না, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একটি স্বচ্ছ যাচাই ব্যবস্থা প্রয়োজন।

রকমারিতে খালিদ আল হুসাইনানের বইয়ের তালিকা। ছবিঃ সংগৃহীত

অধ্যাপক শাফী মো. মোস্তফার মতে, উগ্রবাদ মোকাবিলায় সরকারের স্থায়ী কাঠামো থাকা জরুরি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ঘরানার মানুষের সমন্বয়ে একটি বোর্ড ও তার অধীনে কার্যকর কমিটি গঠন করে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।

নিরাপত্তার পাশাপাশি মুক্ত চিন্তার প্রশ্ন

উগ্রপন্থী মতাদর্শ মোকাবিলার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মুক্ত চিন্তা ও মতপ্রকাশের পরিসর বজায় রাখা। কোনো ধর্মীয় মত বা বইকে শুধু ভিন্নমত হওয়ার কারণে দমন করা এবং সহিংসতা বা সন্ত্রাসকে উৎসাহিত করা মতাদর্শের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এক বিষয় নয়।

তাই বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তা হলো, উগ্রবাদ মোকাবিলায় নির্বিচার নিষেধাজ্ঞার বদলে নির্দিষ্ট মানদণ্ড, স্বচ্ছ যাচাই এবং আইনসম্মত ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য বিকল্প, গবেষণাভিত্তিক ও সৃজনশীল ধর্মীয় সাহিত্য এবং মুক্ত চিন্তার উপযোগী পাঠের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।

বাংলাদেশে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে অতীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযান হয়েছে। কিন্তু বই, অনলাইন কনটেন্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি কেবল অভিযান দিয়ে মোকাবিলা করা কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, সচেতনতা, গবেষণা, পরিবার ও সমাজের ভূমিকা এবং একই সঙ্গে প্রকাশনা ও অনলাইন বিপণন ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি।

ইসলামি বইমেলায় আল-কায়েদার শীর্ষ নেতাদের বই বিক্রির ঘটনা সেই পুরোনো প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে: উগ্রপন্থা মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি শুধু কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটার পর ব্যবস্থা নেবে, নাকি উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তার রোধেও কার্যকর নীতি গ্রহণ করবে?

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি কেবল কয়েকটি বই বিক্রির ঘটনা হিসেবে দেখলে ঝুঁকির গভীরতা বোঝা যাবে না। কারণ উগ্রপন্থার বিস্তার অনেক সময় শুরু হয় মতাদর্শ ও প্রচারণা থেকে। সেই জায়গায় কার্যকর নজরদারি, যাচাই-বাছাই এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে তা জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক সম্প্রীতি ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

এই শাখার আরও খবর

সাতক্ষীরার সেই এমপি গাজী নজরুলের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু

ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানাধীন জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম…

জাতিসংঘের মহাসচিবের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ালেন বাশেলে

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার দৌড় থেকে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশেলে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটিতে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকার পর…

শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে উত্তাল আইআইটি মুম্বাই

ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইআইটি মুম্বাইয়ে শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্ল্যাটফর্মে প্রশ্নপত্র আপলোড করার…

দ্বিতীয় সন্তানের মা হলেন দীপিকা, দুয়ার ঘরে এল নতুন অতিথি

দ্বিতীয়বার মা হয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন। দীপিকা ও রণবীর সিংয়ের পরিবারে এসেছে নতুন সদস্য। শনিবার সন্ধ্যায় কন্যাসন্তানের জন্মের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন তারকা দম্পতি।…

সিডনিতে বৃদ্ধা নারীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির পূর্বাঞ্চলে এক বৃদ্ধা নারীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগে ৪৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১৫…

দৌলতদিয়ায় পার্কিং করা বাসে আগুন, নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা?

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে দৌলতদিয়া বাস টার্মিনালে পার্কিং করে রাখা একটি লোকাল বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au