বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দপ্তরে ‘লিগ্যাল অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তার নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, তিনি যে পদে দায়িত্ব পালন করছেন, সেটির জন্য জাতিসংঘের ক্যারিয়ার পোর্টাল বা প্রকাশ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কোনো নির্দিষ্ট বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের (ওপিজিএ) সরকারি ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানকে ‘Legal Officer – Bangladesh’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি সভাপতির কার্যালয়ের নির্বাহী দপ্তরের সঙ্গে কাজ করবেন। তাঁর জীবনীতে তাকে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যারিস্টার ও আইন এবং নীতিবিষয়ক পেশাজীবী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি ৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দপ্তরে বিভিন্ন দেশের ৪০ জন কর্মকর্তা ও কর্মী কাজ করছেন বলে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাইমার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্নের মূল জায়গা হলো, জাতিসংঘের নিয়মিত নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ‘লিগ্যাল অফিসার’ পদ সাধারণত নির্দিষ্ট গ্রেড, দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, ভাষাগত দক্ষতা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিসহ প্রকাশ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেওয়া হয়। ২০২৬ সালেই জাতিসংঘের ক্যারিয়ার পোর্টালে একাধিক লিগ্যাল অফিসার পদে এমন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের আইনবিষয়ক দপ্তরে পি-৩ গ্রেডের একটি লিগ্যাল অফিসার পদে ১৫ জুলাই ২০২৬ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই পদের জব ওপেনিং আইডি ছিল ২৮০৩৫৮ এবং আবেদনের শেষ সময় ছিল ২২ জুলাই। পদটি জেনারেল লিগ্যাল ডিভিশনের অধীনে ছিল।
এর আগে জুলাই মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রিতে আরেকটি পি-৩ লিগ্যাল অফিসার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। জব ওপেনিং আইডি ২৮০৩০৪-এর ওই পদের বিজ্ঞপ্তিতে দায়িত্ব, তদারকির কাঠামো এবং প্রার্থীর কাজের ক্ষেত্র বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
মে মাসে নাইরোবিতে জাতিসংঘের মানবসম্পদ দপ্তরের অধীনে পি-৩ গ্রেডের আরেকটি লিগ্যাল অফিসার পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। জব ওপেনিং আইডি ২৭১৫৩৩-এর ওই পদের দায়িত্বের মধ্যে ছিল অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থা, শৃঙ্খলাজনিত বিষয় এবং জাতিসংঘের কর্মীদের আচরণবিধি নিয়ে আইনি পরামর্শ দেওয়া।
এ ছাড়া নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অফিস অব লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্সে পি-৪ গ্রেডের লিগ্যাল অফিসার পদেও ২০২৬ সালের মে মাসে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। জব ওপেনিং আইডি ছিল ২৭৮০২২।
এসব উদাহরণ থেকে দেখা যায়, জাতিসংঘে ‘লিগ্যাল অফিসার’ একটি নির্দিষ্ট পেশাগত পদ, যার ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও যোগ্যতার মানদণ্ড সাধারণত স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে। তবে জাইমা রহমান যে পদে দায়িত্ব পালন করছেন, সেটি ঠিক কোন গ্রেডের, কী ধরনের চুক্তির আওতায় এবং কোন নিয়োগ পদ্ধতিতে তাকে নির্বাচন করা হয়েছে, তা প্রকাশ্য ওপিজিএ টিম পেজে উল্লেখ করা হয়নি।
জাইমার শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা
জাতিসংঘের প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, জাইমা রহমান যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে আইন ও নীতিবিষয়ক কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যারিস্টার। তিনি লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে আইন ও রাজনীতি বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পরে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টার হিসেবে পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করেন।
তার জীবনীতে যুক্তরাজ্যের আবাসন, কল্যাণ ও কর্মসংস্থান আইন, স্বাস্থ্য খাতে আইনি পরামর্শ এবং সামাজিক কল্যাণ ও শিক্ষা আইনে প্রো বোনো কাজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে তিনি সাংবিধানিক, করপোরেট ও বাণিজ্যিক আইন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং করসংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করেছেন বলেও জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির প্রথম ধাপের পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ, তার আইন বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ব্যারিস্টার হিসেবে পেশাগত যোগ্যতা রয়েছে। তবে নিয়মিত জাতিসংঘের বিভিন্ন লিগ্যাল অফিসার পদে গ্রেডভেদে যে পরিমাণ সংশ্লিষ্ট ও ক্রমবর্ধমান পেশাগত অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, জাইমার বর্তমান পদে সেই মানদণ্ড কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা প্রকাশ্য তথ্য থেকে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
প্রশ্নটি কোথায়
এখানে মূল প্রশ্ন জাইমা রহমান আইন বিষয়ে যোগ্য কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, তিনি যে পদে দায়িত্ব পালন করছেন সেটির নিয়োগপ্রক্রিয়া কী ছিল।
নিয়মিত জাতিসংঘের লিগ্যাল অফিসার নিয়োগের উদাহরণগুলোতে পদটির গ্রেড, দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু জাইমার ক্ষেত্রে প্রকাশ্য টিম তালিকায় শুধু পদবি, দেশ ও সংক্ষিপ্ত জীবনী রয়েছে। পদটির গ্রেড বা জব ওপেনিং নম্বর সেখানে উল্লেখ নেই।
তবে কোনো পদে জাতিসংঘের ক্যারিয়ার পোর্টালে বিজ্ঞপ্তি না থাকা মানেই নিয়োগটি অনিয়ম হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের মতো বিশেষ ধরনের দপ্তরে নিয়মিত জাতিসংঘের পদ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকতে পারে। তাই জাইমার নিয়োগ কোন ব্যবস্থার অধীনে হয়েছে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সরকারের বক্তব্য
নিয়োগ নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বিএসএস) বলেছেন, জাইমা রহমানের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বিদ্যমান নিয়ম ও নিয়োগপ্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। তাঁর নাম ও পদ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়েছে।
জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, জাইমা সভাপতির দপ্তরে আইনসংক্রান্ত বিষয় দেখবেন। তিনি ওই দপ্তরের নির্বাহী কার্যালয়ের অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটেও জাইমার পদটি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তার নামের পাশে ‘Legal Officer’ এবং দেশ হিসেবে ‘Bangladesh’ লেখা রয়েছে।
নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে যেসব তথ্য স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন
জাইমা রহমানের নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে হলে কয়েকটি তথ্য প্রকাশ করা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। যেমন, তার পদের গ্রেড কী, পদটির দায়িত্ব ও শর্ত কী, এটি ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির জন্য নতুন করে সৃষ্টি করা হয়েছে কি না, এটি নিয়মিত জাতিসংঘের পদ নাকি অন্য কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে, প্রকাশ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল কি না এবং হলে তার জব ওপেনিং নম্বর কী।
এ ছাড়া নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্য প্রার্থী বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, লিখিত পরীক্ষা বা দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষাৎকার হয়েছিল কি না এবং নিয়োগটি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট নৈতিকতা ও স্বার্থের সংঘাতসংক্রান্ত নিয়মের আওতায় পর্যালোচনা করা হয়েছে কি না, এসব তথ্যও নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, জাইমা রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তার আইন বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত যোগ্যতা রয়েছে। একই সঙ্গে, তার নির্দিষ্ট পদের গ্রেড, নিয়োগের ধরন ও বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তার নিয়োগে জাতিসংঘের বিদ্যমান নিয়ম ও প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হওয়া উচিত নিয়োগটি অনিয়ম হয়েছে কি না, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ নথি, পদের কাঠামো এবং বাছাইপ্রক্রিয়ার তথ্য প্রকাশ করা। এসব তথ্য প্রকাশিত হলে জাইমা রহমানের নিয়োগটি কী প্রক্রিয়ায় হয়েছে এবং সেটি সংশ্লিষ্ট নিয়মের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা আরও স্পষ্টভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ