পঞ্চম বিবাহবার্ষিকীর আট দিন পরই নিভে গেল দম্পতির জীবন।
অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এক দম্পতিসহ তিনজন। নিহত দম্পতি শুয়াই ‘মাইকেল’ ঝেং ও তার স্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ওয়াংকে ভালোবাসায় ভরা এক স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী দম্পতি হিসেবে স্মরণ করছেন তাদের স্বজন, বন্ধু ও সহকর্মীরা। দুর্ঘটনার মাত্র আট দিন আগেই তারা তাদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করেছিলেন।
রোববার সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের দিকে ভিক্টোরিয়ার লেডকোর্ট এলাকায় ওয়েস্টার্ন হাইওয়েতে তিনটি গাড়ির সংঘর্ষে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ৩৮ বছর বয়সী শুয়াই ‘মাইকেল’ ঝেং ও তার ৩১ বছর বয়সী স্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ওয়াং একটি এমজি গাড়িতে ছিলেন। গাড়িটি একটি মিতসুবিশি ট্রাইটন ও একটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলেই দম্পতির মৃত্যু হয়।
চীনা নাগরিক মাইকেল ও অ্যাঞ্জেলা ভিক্টোরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে একসঙ্গে নিজেদের জীবন গড়ে তুলছিলেন। সম্প্রতি তারা অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী বসবাসের অনুমতিও পেয়েছিলেন। নতুন জীবনকে আরও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন তারা।
দুজনই স্বাস্থ্যসেবা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মাইকেল ঝেং হরশাম ডেন্টাল গ্রুপে ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন। তার স্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ওয়াং ছিলেন গ্র্যাম্পিয়ানস হেলথ হরশাম ও ডিম্বুলায় কর্মরত একজন নার্স।
দুর্ঘটনার মাত্র আট দিন আগে পঞ্চম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করেছিলেন তারা। বন্ধু জিংজিং ট্যাং ৭নিউজকে জানান, মাইকেল ও অ্যাঞ্জেলা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। পাশাপাশি বলারাটে সম্প্রতি নির্মিত তাদের নতুন বাড়িতে উঠে নতুনভাবে জীবন শুরু করার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন।
জিংজিং ট্যাং বলেন, “সত্যিই মনে হচ্ছিল, তাদের জীবনের একটি নতুন অধ্যায় মাত্র শুরু হতে যাচ্ছে। তারা খুব সুখী ও আশাবাদী ছিলেন। তাদের জন্য আমি সত্যিই আনন্দিত হয়েছিলাম।”
হঠাৎ এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাদের স্বপ্ন থেমে গেলেও বন্ধু ও পরিচিতরা বলছেন, ভালোবাসার এই দম্পতি চিরকাল একসঙ্গেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
অনলাইনে দেওয়া এক শোকবার্তায় বলা হয়েছে, “এত বড় একটি ট্র্যাজেডি। তারা এত অল্প বয়সী ছিলেন এবং তাদের সামনে পুরো জীবন পড়ে ছিল।”
শোকবার্তায় আরও লেখা হয়, “জীবন ও অনন্তকালেও তারা চিরকাল একসঙ্গে, এক বন্ধনে আবদ্ধ থাকবেন।”
মাইকেল ঝেংয়ের সাবেক এক সহকর্মী তাকে একজন বিবেচনাশীল, যত্নশীল ও সত্যিকারের ইতিবাচক মানুষ হিসেবে স্মরণ করেছেন।
হরশাম ডেন্টাল গ্রুপ এক বিবৃতিতে জানায়, “মাইকেল ছিলেন একজন অসাধারণ মানুষ। আমরা তাকে চিনতে পেরেছি, তার সঙ্গে কাজ করেছি এবং তাকে আমাদের বন্ধু বলতে পেরেছি, এ জন্য আমরা গর্বিত।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “মাইকেলের কাছ থেকেই আমরা অ্যাঞ্জেলাকে নিয়ে অনেক মিষ্টি গল্প শুনেছি। ইচ্ছে ছিল, তার সঙ্গে আরও ভালোভাবে পরিচিত হতে পারলে ভালো হতো। তারা দুজনই কমিউনিটির মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও সম্মানিত ছিলেন। তাদের গভীরভাবে মিস করা হবে। আমরা তাদের চিরকাল আমাদের হৃদয়ে স্মরণ করব।”
অ্যাঞ্জেলা ওয়াংয়ের এক বন্ধু ও সহকর্মীও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, অ্যাঞ্জেলা কঠিন সময়কেও বড় হাসি ও শান্ত স্বভাবের সঙ্গে মোকাবিলা করতেন।
ওই সহকর্মী লিখেছেন, “দীর্ঘ রাতের শিফট কিংবা বিকেলের শিফটের পরও তোমার সেই হালকা করে কাঁধে হাত রাখা এবং এরপর কপালে স্পর্শ করে খুব নিচু স্বরে বলা, ‘আমি খুব ক্লান্ত’… সেই মুহূর্তগুলো এখনো মনে পড়ে।”
তিনি আরও লিখেছেন, “তুমি এমনকি সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোকেও বড় হাসি ও শান্ত স্বভাবের সঙ্গে মোকাবিলা করতে। ভেতরে ও বাইরে থেকে সুন্দর এবং দয়ালু একজন মানুষ। আমাদের পৃথিবীর সেই দেবদূত এখন স্বর্গে।”
এই দুর্ঘটনায় ১৪ বছর বয়সী টেনেশা ফিল্ডসেন্ডও প্রাণ হারিয়েছে। একটি ভলিবল টুর্নামেন্ট শেষে বাড়ি ফেরার পথে সে দুর্ঘটনার শিকার হয়।
টেনেশা মিতসুবিশি ট্রাইটন গাড়িটির যাত্রী ছিল। গাড়িটি অন্য দুটি গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ল্যাট্রোব ভ্যালি ভলিবলের এক মুখপাত্র টেনেশাকে তাদের ক্রীড়া সম্প্রদায়ের অত্যন্ত প্রিয় একজন সদস্য হিসেবে স্মরণ করেছেন। তার সতীর্থ, কোচ, বন্ধু এবং ভলিবল সম্প্রদায়ের অন্য সদস্যরা তাকে গভীরভাবে মিস করবেন বলে জানান তিনি।
মুখপাত্র বলেন, “সপ্তাহান্তে হরশামে অনুষ্ঠিত ভলিবল ভিক্টোরিয়া জুনিয়র কান্ট্রি চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জপদকজয়ী দলের অংশ ছিল সে। বিষয়টি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে।”
তিনি আরও বলেন, “সতীর্থদের সঙ্গে এমন একটি অসাধারণ অর্জন ভাগ করে নেওয়া এবং তাদের জন্য একটি স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করা সত্যিই দারুণ ব্যাপার।”
“টেনেশার পরিবার, বন্ধু এবং যারা তাকে জানার সুযোগ পেয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা ও গভীর সহানুভূতি রইল। তাকে গভীরভাবে মিস করা হবে এবং ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।”