ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ছবি : সংগৃহীত
সাবেনাক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দণ্ড কার্যকর করার সক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই বলে মনে করেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তাঁর মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং শেখ হাসিনার পরিবারের ঐতিহাসিক ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি দেখা প্রয়োজন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন রুমিন ফারহানা। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা, তাঁর বিচার, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে রাজনৈতিক ইতিহাস, প্রতিশোধের রাজনীতি, দলীয় নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎ এবং ইতিহাসে শেখ হাসিনার অবস্থান নির্ধারণের প্রসঙ্গ।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়, মুক্তির আন্দোলন এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের সঙ্গে দলটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ছয় দফা থেকে শুরু করে স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রুমিনের মতে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং শেখ হাসিনার পরিবারের ইতিহাসও তাঁর দেশে ফেরার প্রশ্নে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পারিবারিক ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করতে গেলে এসব ঐতিহাসিক ঘটনাও উপেক্ষা করা যায় না।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গও তোলেন রুমিন ফারহানা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় শেখ হাসিনা দেশে না ফিরলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ভিন্ন হতে পারত। তখন দলটি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দলটি আবার সংগঠিত হওয়ার এবং রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।
তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না রুমিন। তাঁর মতে, দলটির নেতাকর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের ভবিষ্যৎও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় রাজনৈতিক দলের বিপুলসংখ্যক অনুসারীর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা বিবেচনা না করে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝা সম্ভব নয়।
সাক্ষাৎকারে দেশের কারাগারগুলোর পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। রুমিনের দাবি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বন্দীর সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে কারাগারের বাথরুমেও মানুষকে থাকতে হচ্ছে। অন্য একটি মামলায় জামিন করানোর সূত্রে তিনি এমন তথ্য পেয়েছেন বলে জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাটি রাজনৈতিক নয়, চুরির মামলা ছিল।
রুমিন ফারহানার মতে, শেখ হাসিনা দেশে না ফিরলে তাঁর অনুসারী ও সমর্থকদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিণতি কী হবে, তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আচরণ এবং দেশে বহুদলীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎও গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হতে পারে—এ বিষয়টি স্বীকার করেন রুমিন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলা করলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সরকার পরিচালনার দীর্ঘ সময় এবং বিরোধী দলে থাকার সময়কার ভূমিকা নিয়ে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য, ব্যর্থতা ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোও ইতিহাসের আলোচনায় আসতে পারে।
শেখ হাসিনার বিচার ও সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সক্ষমতা নিয়ে রুমিনের মন্তব্য সাক্ষাৎকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি মনে করেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার বিচার হতে পারে এবং মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। তবে বর্তমান সরকারের পক্ষে সেই দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও রুমিনের বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। দলটি বিরোধী দলে থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন তিনি। তাঁর দৃষ্টিতে, আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশেও এর প্রতিফলন ঘটতে পারে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নে তাই রুমিন ফারহানা একাধিক বিষয়কে সামনে এনেছেন। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকা, শেখ হাসিনার পরিবারের ওপর ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড, ১৯৮১ সালে তাঁর প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য, দলীয় নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎ এবং তাঁর রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন। এসব বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করেই দণ্ড নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁর বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়।