বাংলাদেশ

শাহজালালে অগ্নিকাণ্ডের একবছর: কতটা বদলালো কার্গো এলাকার নিরাপত্তা

  • 1:12 pm - October 18, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৭৯ বার
শাহজালালে অগ্নিকাণ্ডের একবছর: কতটা বদলালো কার্গো এলাকার নিরাপত্তা।ছবি: সংগৃহীত

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। গত বছরের ১৮ অক্টোবরের ওই আগুনে পুড়ে যায় হাজার কোটি টাকার পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নথি। ঘটনার পর বিমানবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে ১৪ দফা সুপারিশ করা হলেও কার্গো ব্যবস্থাপনায় এখনো ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন আমদানিকারকেরা। অন্যদিকে, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দাবি, অগ্নিনিরাপত্তা বাড়াতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে।

গত বছরের ১৮ অক্টোবর দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটসংলগ্ন কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা কাজ করেন। ওই দিন রাত ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে বিমান চলাচল আবার শুরু হয়। তবে আগুন পুরোপুরি নেভাতে পরদিন ১৯ অক্টোবর বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৭ ঘণ্টা ধরে চলে আগুন নেভানোর কাজ। এ ঘটনায় ২৫ জন আনসার সদস্যসহ মোট ৩৫ জন আহত হন।

ঘটনার পর বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে ১৪টি সুপারিশ করে। এর মধ্যে ছিল অস্থায়ী ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন, ফায়ার হাইড্রেন্ট ও স্প্রিংকলার ব্যবস্থা চালু, জরুরি সংকেত স্থাপন, ফায়ার বক্সসহ হোস পাইপ বসানো, অচল ফায়ার হাইড্রেন্ট মেরামত এবং স্থায়ী ফায়ার স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ। পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তার অবকাঠামো উন্নয়ন ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়।

এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মাধ্যমে কর্মীদের প্রশিক্ষণ, জেনারেল এভিয়েশন হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সে ফায়ার হাইড্রেন্ট, স্প্রিংকলার ও ধোঁয়া শনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম রাখার কথা বলা হয়। এসব সুপারিশের অগ্রগতি নিয়ে কর্তৃপক্ষ আশাবাদী হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আমদানিকারকেরা।

আমদানিকারকদের দাবি, এখনো ঝুঁকি রয়েছে

শাহজালাল বিমানবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম ভূঁইয়া মিঠু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকেরা এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার পর এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তারপরও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমদানিকারকেরা পণ্য আমদানি অব্যাহত রেখেছেন।

খায়রুল আলম ভূঁইয়া মিঠুর ভাষ্য, নতুন কার্গো কমপ্লেক্স এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। আধুনিক এই কমপ্লেক্স চালু হলে পণ্য শেডের ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার পরিস্থিতি কমত। বর্তমানে এভাবে পণ্য পড়ে থাকায় একদিকে যেমন ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, অন্যদিকে অগ্নিঝুঁকিও বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, গত এক বছরে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে দৃশ্যমান অগ্রগতি তাঁদের চোখে পড়েনি। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিজেদের দিক থেকে কিছু পদক্ষেপ নিয়ে থাকতে পারে। তবে আমদানিকারকদের দৃষ্টিতে কার্গো ব্যবস্থাপনায় এখনো নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দাবি, উন্নতি হয়েছে

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক (কার্গো, অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাশিদুল করিম বলেন, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পুরো এলাকাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। কয়েকটি গেট তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দ্রুত পণ্য খালাস করা যাচ্ছে। এ ছাড়া কার্গো কমপ্লেক্সের একটি অংশ ব্যবহার শুরু হয়েছে।

তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, বর্তমানে পণ্য খালাসে আগের মতো বেশি সময় লাগছে না। সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করায় পণ্য সরবরাহের কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।

অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে নানা উদ্যোগের কথা জানাল বেবিচক

বেবিচকের সদস্য (পরিকল্পনা ও পরিচালন) মেহবুব খান বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছিল। সেখানে দেওয়া সুপারিশগুলোর প্রায় সবই বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। তাঁর মতে, কার্গো এলাকার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়িত্ব বিমান ও কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোরও রয়েছে। বেবিচক তাদের জায়গা ইজারা দিয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দুর্বলতা দূর না করলে দুর্ঘটনার দায়ও তাদের বহন করতে হবে।

বেবিচকের ফায়ার সেফটি বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর বিমানবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে ব্যাপক কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অফিসের বৈদ্যুতিক তারের অবস্থা পরীক্ষা করা হয়েছে, কোথাও ঢিলা সংযোগ রয়েছে কি না কিংবা শর্টসার্কিটের আশঙ্কা আছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র ও সতর্কসংকেত ব্যবস্থার কথা রয়েছে। কোথাও ধোঁয়া শনাক্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কসংকেত বেজে উঠবে। পাশাপাশি প্রতিদিন ভোর, সকাল ও রাতে নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে।

বেবিচকের মুখপাত্র কাওছার মাহমুদ বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর এলাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্রেন্টও স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি জানান, অগ্নিনিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন অফিসে প্রতি মাসে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে। এ ছাড়া টার্মিনাল ভবন এলাকায় কর্মরত ১ হাজার ৯০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে অগ্নিনিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ব্যবহার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

কাওছার মাহমুদ আরও বলেন, সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধের দিনেও বিমানবন্দরে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও টহল অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

তবে অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পরও নতুন কার্গো কমপ্লেক্স পুরোপুরি চালু না হওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকদের ক্ষতিপূরণ না পাওয়া এবং কার্গো ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি থাকার অভিযোগের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের নেওয়া উদ্যোগগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নির্ধারণে সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন এবং কার্গো এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এই শাখার আরও খবর

ফজলে করিমের জামিনে ঘুষ দাবি, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে ব্রিটিশ প্রতিবেদনে উদ্বেগ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০২৬ সালের…

মুম্বাইয়ে টাইগার শ্রফকে হত্যাচেষ্টার দাবি বিষ্ণোই গ্যাংয়ের, গুলিবিদ্ধ গাড়িচালক

ভারতের বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় হত্যাচেষ্টার দাবি করেছে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং। রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা…

এটিওতে ক্রেডিট কার্ডে কর পরিশোধ বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত, আলবানিজ-চালমার্সের দ্বন্দ্বের খবর নাকচ শ্রমমন্ত্রীর

অস্ট্রেলিয়ার কর দপ্তরে (এটিও) ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কর পরিশোধ বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ও অর্থমন্ত্রী জিম চালমার্সের মধ্যে মতবিরোধের গুঞ্জন উঠেছে।…

বিতর্কের মুখে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে অংশগ্রহণ এবং অভিযানের সময় কয়েকজনকে ধরতে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর বিতর্কের মুখে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য…

জানুয়ারিতে শুরু ‘একুশের’ বইমেলা, ফেব্রুয়ারির ঐতিহ্য থেকে সরে যাওয়ার প্রশ্ন

অমর একুশে বইমেলা মানেই ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীর সংযোগ। দীর্ঘদিন ধরে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে আয়োজিত এই বইমেলা লেখক, পাঠক ও…

বেঁচে থাকলে দেশ ও মানুষের সেবায় শেখ হাসিনার একনিষ্ঠ ছায়াসঙ্গী হতেন শেখ রাসেল

কিছু মৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান ঘটায় না, থামিয়ে দেয় অসংখ্য সম্ভাবনার অঙ্কুরোদ্গম। কিছু হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে না, একটি জাতির বিবেককে চিরদিনের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au