যোদ্ধা নিয়োগের লক্ষ্যে আয়োজিত সমাবেশে অংশ নিয়েছেন হুতিদের অনুগত যোদ্ধারা। ইয়েমেনের রাজধানী সানায়। ফাইল ছবি: এএফপি
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের অগ্রগতি ঠেকাতে আবারও সহযোগিতার পথে হাঁটছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দক্ষিণ ইয়েমেনে হুতিবিরোধী সরকারপন্থী কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নতুন করে অর্থায়ন করতে সম্মত হয়েছে আমিরাত। বিনিময়ে এসব বাহিনীকে আকাশপথে সুরক্ষা দেবে সৌদি আরব। ইয়েমেনের কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই উপসাগরীয় শক্তির মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ রয়েছে। তবে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং সৌদি আরবে ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা দুই দেশকে আবারও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। নতুন এই সহযোগিতা তাদের বিরোধ কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এর ফলে ইয়েমেনের চলমান সংঘাত নতুন মোড় নিতে পারে।
সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো হুতিদের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিবিরোধী বাহিনীগুলোর সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে আমিরাতের ফিরে আসার সম্ভাবনা সংঘাতের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
হুতিবিরোধী বাহিনীকে ফের অর্থায়ন
দক্ষিণ ইয়েমেনে হুতিবিরোধী বাহিনীগুলোর মধ্যে ‘জায়ান্ট ব্রিগেডস’ অন্যতম শক্তিশালী। একসময় এই বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন দিত আমিরাত। হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের কার্যকর সামরিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে সৌদি আরবের সঙ্গে বিরোধের জেরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইয়েমেনে হুতিবিরোধী সামরিক তৎপরতা থেকে সরে যায় আমিরাত। একই সঙ্গে জায়ান্ট ব্রিগেডসের অর্থায়নও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এবার হুতিদের অগ্রগতি ঠেকাতে সেই বাহিনীসহ সরকারপন্থী কয়েকটি গোষ্ঠীকে আবারও অর্থায়নের পরিকল্পনা করছে আবুধাবি। বিনিময়ে তাদের সামরিক অভিযানে সৌদি আরবের বিমান সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়লেও ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধ এখনো কাটেনি।
দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতার প্রশ্ন
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এ সপ্তাহে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। সৌদি আরব ও আমিরাত এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি।
১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন পৃথক রাষ্ট্র ছিল। গণভোটের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের স্বাধীনতার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পুরোনো সীমান্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হতে পারে।
বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) বাহিনী এখনো সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমান্তের বাইরে অভিযান চালাতে রাজি নয়। তবে সৌদি আরব গণভোটের বিষয়ে স্পষ্ট সমর্থন দিলে এই অবস্থান পরিবর্তন হতে পারে।
এদিকে এডেনভিত্তিক জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার গত সপ্তাহে রাজধানী সানা থেকে হুতিদের হটাতে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। তবে মারিবের কাছে মাজজার এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি এলাকায় সরকারি বাহিনীর অগ্রগতি এখনো সীমিত।
এসটিসি নেতা আইদারুস আল-জুবাইদির সঙ্গেও সৌদি কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ নেই। গত জানুয়ারিতে দক্ষিণ ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং দুই বছরের মধ্যে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি আবুধাবিতে পালিয়ে যান।
এরপর এসটিসির জন্য আমিরাতের পাঠানো অস্ত্রের চালানে বোমা হামলা চালায় সৌদি আরব। ওই ঘটনার পর ইয়েমেনের সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয় আমিরাত। অন্যদিকে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার আল-জুবাইদিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানিয়েছিল।
তাইজ ও মারিব দখলে নিতে মরিয়া হুতিরা
ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আমিরাতের কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও হুতিরা তাইজ ও মারিব শহর দখলে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শহর দুটি সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানার বাইরে অবস্থিত এবং সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
গত শুক্রবার হুতিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র এডেন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানে। তখন সেখানে একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে এ ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-এরিয়ানি জানান, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ইয়েমেনিয়া এয়ারওয়েজের উড়োজাহাজ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার এবং রানওয়ের মাঝামাঝি স্থান থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে পড়ে।
এর এক দিন আগে এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হুতিদের হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ১৬ জন আহত হন।
একের পর এক হামলা ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি সৌদি আরব ও আমিরাতের নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়িয়ে তুলছে।
সৌদি আরবের পাশে থাকার ঘোষণা মিসরের
ইয়েমেন সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সৌদি আরবের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে মিসর। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি জানিয়েছেন, সৌদি আরবকে সুরক্ষা দিতে মিসরের সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে পার্লামেন্টে জরুরি অধিবেশন ডাকা হচ্ছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, মিসর কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেবে না। দেশটির ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকবে সৌদি আরবকে সুরক্ষা দেওয়ার মধ্যে।
এদিকে সৌদি আরব যুক্তরাজ্যের কাছেও অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা চেয়েছে। এরই মধ্যে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি ভয়েজার উড়োজাহাজ পাঠানো হয়েছে, যা আকাশে অন্যান্য উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে।
তবে আঞ্চলিক কূটনীতিকেরা মনে করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি ওমান, কাতারসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
ব্রিটিশ সামরিক সহায়তা নিয়ে আইনি জটিলতা
ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে যুক্তরাজ্যের আরও বেশি সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত রায় দিয়েছিলেন, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ইয়েমেনে সৌদি আরবের বোমা হামলার সময় অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার বেআইনিভাবে কাজ করেছিল।
অস্ত্রবাণিজ্যবিরোধী সংগঠন ক্যাম্পেইন এগেইনস্ট আর্মস ট্রেডের অভিযোগ ছিল, ইয়েমেনে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে ব্রিটিশ সরকার তাদের মূল্যায়নপ্রক্রিয়া সংশোধন করে।
সৌদি আরবের দাবি, ওই সময়ের পর থেকে তাদের সামরিক কার্যক্রমের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। দেশটি আরও বলছে, জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই তারা পদক্ষেপ নিচ্ছে।
গত ১৫ অক্টোবর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গৃহীত এক প্রেসিডেনশিয়াল বিবৃতিতেও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা স্বীকার করা হয়।
বাস্তুচ্যুত দুই লাখের বেশি মানুষ
ইয়েমেনে আগস্ট থেকে শুরু হওয়া নতুন করে সংঘাতে এ পর্যন্ত কত মানুষ নিহত হয়েছেন, তার নির্ভুল হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে এডেনভিত্তিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। সামরিক তৎপরতা আরও বিস্তৃত হলে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকটও তীব্র হতে পারে।
সৌদি আরব ও আমিরাতের নতুন সহযোগিতা হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এই সমঝোতা ইয়েমেনের যুদ্ধের সামরিক ভারসাম্য এবং দক্ষিণাঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান