অস্ট্রেলিয়ার শিল্পমন্ত্রী টিম আয়ার্স এমন দাবি নাকচ করেছেন যে, কর দপ্তরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কর পরিশোধ বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকরের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ কে নিয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ অর্থমন্ত্রী জিম চালমার্সের ওপর অসন্তুষ্ট। ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার কর দপ্তরে (এটিও) ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কর পরিশোধ বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ও অর্থমন্ত্রী জিম চালমার্সের মধ্যে মতবিরোধের গুঞ্জন উঠেছে। তবে দুই নেতার সম্পর্কে টানাপোড়েনের খবর নাকচ করেছেন দেশটির শিল্পমন্ত্রী টিম আয়ার্স। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক সংস্কারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
কর পরিশোধে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সময়সীমা পেছানোর সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসিসিআই) প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু ম্যাককেলারের কাছ থেকে খুদে বার্তা পাওয়ার পর তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন। তবে অর্থমন্ত্রী চালমার্সের দাবি, ওই বার্তা পাওয়ার আগেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করছিলেন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন।
রোববার নিউজ২৪-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শিল্প ও উদ্ভাবনমন্ত্রী টিম আয়ার্সকে প্রশ্ন করা হয়, এ ঘটনায় অর্থমন্ত্রীর ওপর কি বিরক্ত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী? জবাবে তিনি বলেন, ‘না, তিনি বিরক্ত নন।’
আয়ার্স বলেন, সরকার একটি স্থিতিশীল মন্ত্রিসভা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এ ক্ষেত্রে বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির সঙ্গে বর্তমান সরকারের কাজের ধরনও তুলনা করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীই যে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্বে থাকেন, তা স্বীকার করে আয়ার্স বলেন, আলবানিজ মন্ত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেন।
তিনি বলেন, ‘মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং অ্যান্থনি যেভাবে নেতৃত্ব দেন, তা নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ সারা জীবনে দেখা নেতৃত্বের ধরনের সঙ্গেই মেলে।’
আয়ার্স আরও বলেন, ‘তিনি তাঁর দলের সদস্যদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনেন। মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শোনেন। মন্ত্রিসভায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় আলোচনা হয়, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয় এবং সমাধান করা হয়।’
প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন
আলবানিজ ও চালমার্সের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন, এমন প্রশ্নেরও মুখোমুখি হন আয়ার্স। তবে সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি সরকারের সংস্কার কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে বড় ধরনের সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নানা চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
আয়ার্সের ভাষায়, ‘আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে কাজ করছি, যা আমাদের প্রত্যাশিত বিশ্বপরিস্থিতি নয়। এখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য চাপ রয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের স্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে আমাদের বড় সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নিতে হচ্ছে।’
২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময় পেল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো
অস্ট্রেলিয়ার কর দপ্তর এটিওতে কর পরিশোধের ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত কার্যকরের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার পর এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কর পরিশোধ করতে পারবে।
আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া কার্ড লেনদেনের অতিরিক্ত ফি যাতে শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়, সে উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা বন্ধ করার কথা ছিল।
গত ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড সারচার্জ নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতেই পরিবর্তনটি আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

কর দপ্তরে ক্রেডিট কার্ডে অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে কে ভূমিকা রেখেছেন, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের পর অস্ট্রেলিয়ার ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির শীর্ষ পর্যায়ে মতবিরোধের অভিযোগ খারিজ করেছেন শিল্পমন্ত্রী টিম আয়ার্স। ছবি: নিউজওয়্যার / মার্টিন ওলম্যান।
প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ জানান, গত বৃহস্পতিবার সকালে এসিসিআইয়ের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু ম্যাককেলার তাঁকে খুদে বার্তা পাঠান। এর পরদিনই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
আলবানিজ বলেন, ‘আমার দরজা সব সময় খোলা। অ্যান্ড্রু ম্যাককেলার গত বৃহস্পতিবার সকালে আমাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, আর শুক্রবার সকালেই আমরা ঘোষণা দিয়েছি।’
তবে অর্থমন্ত্রী চালমার্সের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, বুধবারই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দপ্তরও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল।
অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত স্থগিতের প্রক্রিয়ায় কার ভূমিকা কতটা ছিল, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে সময়ের পার্থক্য রয়েছে।
সারচার্জ সংস্কারের পক্ষে শিল্পমন্ত্রী
ক্রেডিট কার্ডে কর পরিশোধের সুযোগ আরও কিছুদিন চালু রাখার সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন আয়ার্স। তাঁর মতে, সামগ্রিকভাবে সারচার্জ সংস্কারের ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় কমবে।
তিনি বলেন, এটিওর ক্ষেত্রে বিষয়টি সারচার্জের মাধ্যমে সমাধান করার সুযোগ নেই বলেই তাঁর ধারণা। সরকার ক্রেডিট কার্ডে কর পরিশোধের সুযোগ অব্যাহত রাখতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে সরকারের বাজেটের ওপর উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের চাপ পড়বে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তটি যথাযথ।
আয়ার্স আরও বলেন, সারচার্জসংক্রান্ত মূল সংস্কারের ফলে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ব্যয় কমেছে। ভোক্তারা কোনো বিল পরিশোধের সময় ঠিক কত টাকা দিতে হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে জানতে পারবেন, এটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে বিব্রত করার অভিযোগ বিরোধীদের
সরকারের দুই শীর্ষ নেতার বক্তব্যের পার্থক্য নিয়ে সমালোচনা করেছে বিরোধী জোট। বিরোধী দলের ছায়া অর্থমন্ত্রী টিম উইলসন অভিযোগ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী বারবার অর্থমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে তাঁকে প্রকাশ্যে বিব্রত করছেন।
নিউজ২৪-কে উইলসন বলেন, ‘আমি এটিকে একটি ধারাবাহিক আচরণ হিসেবে দেখছি। প্রধানমন্ত্রী বারবার হস্তক্ষেপ করছেন, নিজের অর্থমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত পাল্টে দিচ্ছেন এবং তাঁকে জনসমক্ষে অপদস্থ করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাই আমার ধারণা, এতে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি হতে পারে।’
তবে শিল্পমন্ত্রী টিম আয়ার্স প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বিরোধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ক্রেডিট কার্ডে কর পরিশোধের সুযোগ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক চললেও সরকার তার অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
সূত্র: নিউজ২৪ অস্ট্রেলিয়া