রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর দীর্ঘ আট দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ডানা মেলছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে চালু হচ্ছে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। রোববার (১৫ অক্টোবর) পশ্চিম সিডনির ব্যাজেরিস ক্রিকে নবনির্মিত ‘ওয়েস্টার্ন সিডনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ (ন্যান্সি-বার্ড ওয়ালটন) থেকে শুরু হচ্ছে নিয়মিত বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল। পাঁচ দশকের বেশি সময় পর অস্ট্রেলিয়ায় সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রধান বিমানবন্দর চালুর মধ্য দিয়ে দেশটির বিমান পরিবহন খাতে যুক্ত হচ্ছে নতুন অধ্যায়।
সিডনির কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত বিমানবন্দরটি দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টা পরিচালিত হবে। বর্তমানে সিডনির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে নতুন বিমানবন্দরে এ ধরনের নৈশকালীন নিষেধাজ্ঞা না থাকায় রাত ও ভোরেও উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে পারবে।
বছরে এক কোটি যাত্রী দিয়ে যাত্রা শুরু
প্রাথমিকভাবে ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রানওয়ে ও সমন্বিত টার্মিনাল নিয়ে চালু হচ্ছে বিমানবন্দরটি। রানওয়েটিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ এয়ারবাস এ৩৮০ ওঠানামার সক্ষমতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে বছরে এক কোটি যাত্রী পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ভবিষ্যতে দ্বিতীয় রানওয়ে নির্মাণ ও টার্মিনাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ সক্ষমতা বছরে আট কোটি যাত্রীর পর্যায়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিমানবন্দরটির অন্যতম প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে প্রচলিত পদ্ধতির এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের পরিবর্তে ডিজিটাল রিমোট ব্যবস্থায় উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
আট দশকের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন
সিডনিতে দ্বিতীয় বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৪৬ সালে, তৎকালীন লেবার সরকারের আমলে। পরে ১৯৮৬ সালে আবারও লেবার সরকারের সময় ব্যাজেরিস ক্রিকে প্রায় ১ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তবে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক মতবিরোধ ও অনিশ্চয়তার কারণে প্রকল্পটির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।
২০১৪ সালে লিবারেল জোট সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিমানবন্দরটিতে কার্গো ফ্লাইট চালু করা হয়। এবার নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট চালুর মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
যাত্রীবাহী ফ্লাইট চালাবে যেসব এয়ারলাইনস
শুরুর পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ রুটে সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বাজেট এয়ারলাইন জেটস্টারের। আন্তর্জাতিক রুটে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিয়েছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, এয়ার নিউজিল্যান্ড ও ভিয়েতজেট।
এ ছাড়া ২০২৭ সাল নাগাদ কোয়ান্টাস ও কাতার এয়ারওয়েজও বিমানবন্দরটি থেকে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বস্তি বাড়বে প্রবাসী বাংলাদেশিদের
নতুন বিমানবন্দর চালু হওয়ায় পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম সিডনিতে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির যাতায়াত আরও সুবিধাজনক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে এসব এলাকায় বসবাসকারীদের সিডনির প্রচলিত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।
তবে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে গণপরিবহন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে। কেন্দ্রস্থল থেকে দূরত্বের বিষয়টিও যাত্রীদের কাছে বিমানবন্দরটির আকর্ষণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বিমানবন্দরটি পশ্চিম সিডনির অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিমান পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যসহ অস্ট্রেলিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ
নতুন বিমানবন্দরটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে মেট্রোরেল, মোটরওয়ে ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণসহ অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার এবং নিউ সাউথ ওয়েলস সরকারের মোট বিনিয়োগ ২৫ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা।
দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত এই বিমানবন্দর চালুর মধ্য দিয়ে সিডনির বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।