রবীন্দ্র ঋষিকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা, কী হয়েছিল সেদিন?
ময়মনসিংহের ভালুকায় সেলুনে ঢুকে রবীন্দ্র ঋষি (৪৩) নামে এক নরসুন্দরকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জামিরদিয়া এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে এ ঘটনা…
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে মরমী সাধক ও লোককবি রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থল সংলগ্ন এলাকায় গানবাজনার আয়োজন বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘কেশবপুর ইসলামিক অর্গানাইজেশন’। এ দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সংগঠনটির সদস্যরা। কবরস্থানের পবিত্রতা রক্ষার যুক্তিতে তোলা এই দাবি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, ধর্মীয় অনুভূতি ও কবরস্থানের মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি বাংলার লোকসংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
সোমবার দুপুরে জগন্নাথপুরের ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিনের কাছে আবেদনটি জমা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়েছে, জগন্নাথপুর পৌরসভার কেশবপুর বাজার এলাকার কবরস্থানসংলগ্ন স্থানে গানবাজনার আয়োজন করা হলে স্থানীয়দের মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংগঠনটির সদস্য ও আবেদনকারী রফিক মিয়া দাবি করেন, তাঁদের আপত্তি রাধারমণ দত্তকে স্মরণ করে অনুষ্ঠান আয়োজনের বিরুদ্ধে নয়, বরং কবরস্থানের পাশে গানবাজনা করার বিরুদ্ধে। তাঁর ভাষ্য, গত দুই বছর ধরে কেশবপুরে রাধারমণের সমাধির পাশে, কবরস্থানঘেঁষা জায়গায় কোনো অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হচ্ছে না। এবারও ওই স্থানে আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তাঁরা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেন।
রফিক মিয়া আরও বলেন, আবেদনের পর প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং অন্য কোনো স্থানে অনুষ্ঠান আয়োজনের আশ্বাস দিয়েছে। তবে ইউএনও অনুষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন বলে তাঁর যে দাবি, প্রশাসনের বক্তব্যে সেটির সমর্থন পাওয়া যায়নি। ইউএনও জানিয়েছেন, আবেদনটি মূলত কবরস্থানের পাশে অনুষ্ঠান না করার অনুরোধসংক্রান্ত।
জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামেই অবস্থিত মরমী সাধক রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থল। বাংলা লোকসংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত রাধারমণ ধামাইল গানের বিকাশ ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর রচিত গান বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁকে স্মরণ করে প্রতিবছর সমাধিস্থল এলাকায় বাউল গানের আসর বসে। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের উদ্যোগেও সেখানে স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এমন একজন লোকসাধকের সমাধিস্থলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্থান পরিবর্তনের দাবি তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান কোথায় হবে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতির চর্চা এবং সাংস্কৃতিক পরিসর রক্ষার বিষয়ও।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কবরস্থানের মর্যাদা ও পরিবেশ রক্ষার দাবি আলোচনার বিষয় হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে গানবাজনা নিয়ে আপত্তি উঠলে তার সমাধান এমনভাবে হওয়া প্রয়োজন, যাতে স্থানীয়দের ধর্মীয় অনুভূতি ও শান্তি-শৃঙ্খলার বিষয় বিবেচনায় থাকে, আবার লোকসংস্কৃতির চর্চাও অযৌক্তিকভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়। এ ক্ষেত্রে কবরস্থানের সীমানা, অনুষ্ঠানস্থলের অবস্থান, শব্দের মাত্রা এবং আয়োজনের ধরন বিবেচনা করে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে কবরস্থানের পাশে গানবাজনা হলে বিরোধ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে, এমন আশঙ্কার ভিত্তি কী, তা আবেদনকারীদের বক্তব্যে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। একইভাবে রাধারমণ দত্তের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানের কারণে কবরস্থানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়নি। ফলে শুধু আশঙ্কার ভিত্তিতে লোকসংস্কৃতির একটি দীর্ঘদিনের আয়োজনের পরিসর সংকুচিত করার আগে বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে।
এ বিষয়ে জগন্নাথপুরের ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, “আসলে গানবাজনা বন্ধের আবেদন করা হয়নি। তারা একটি চিঠি দিয়ে বলেছেন, কেশবপুর গ্রামের কবরস্থানের পাশে যেন গানবাজনার আয়োজন করা না হয়।”
তিনি জানান, কবরস্থানের পবিত্রতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে লোককবি রাধারমণ দত্তের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
প্রশাসনের এই বক্তব্যে আপাতত অনুষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ করার বদলে স্থান ও আয়োজনের ধরন নিয়ে সমঝোতার পথ খোলা রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান কোথায় হবে এবং কীভাবে আয়োজন করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রাধারমণ দত্তের মতো লোকসাধকের স্মৃতি ও সৃষ্টিকে ঘিরে সাংস্কৃতিক আয়োজন বাংলার লোকঐতিহ্য সংরক্ষণেরও একটি মাধ্যম। তাই কবরস্থানের মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁর স্মরণে সংগীতচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো, কোনো পক্ষের ধর্মীয় অনুভূতিকে উপেক্ষা না করে এবং লোকসংস্কৃতির চর্চাকে অযথা সংকুচিত না করে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au