বাংলাদেশ

মতামতঃ মানিক লাল ঘোষ

প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা-​অবিস্মরণীয় বন্ধুত্বের রূপকার: ইতিহাসের আলোয় ইন্দিরা গান্ধী ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

  • 6:23 pm - October 31, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৪ বার
লেখকঃ মানিক লাল ঘোষ

​ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু ব্যক্তিত্ব অমর হয়ে থাকেন, যাঁদের দূরদর্শিতা ও সাহসিকতা কেবল নিজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দেয়। ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির রাষ্ট্রনায়কদের একজন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এবং বাংলাদেশের পক্ষে অটল অবস্থান আমাদের জন্মলগ্নে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। বাঙালির হৃদয়ে তিনি চিরজাগরূক হয়ে আছেন এক গভীর কৃতজ্ঞতার আসনে।

​১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র মানুষের ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা চালায়, তখন বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ বাংলাদেশের পক্ষে সহজ ছিল না। পরাশক্তিগুলোর একটি বড় অংশ ছিল পাকিস্তানের পক্ষে কিংবা নীরব দর্শক। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করতে অসাধারণ কূটনৈতিক উদ্যোগ নেন। তিনি নিজে বিশ্ববাসীর দুয়ারে দুয়ারে ছুটে গেছেন।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি পাকিস্তানের বর্বরতা এবং পূর্ব বাংলার যৌক্তিক মুক্তি সংগ্রামকে বিশ্বমঞ্চে জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই অবিরাম কূটনৈতিক তৎপরতার ফলেই বিশ্বজনমত ধীরে ধীরে বাংলাদেশের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে।
​১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ বাঙালি সর্বস্ব হারিয়ে ভারত সীমান্ত পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছিল। প্রায় ১ কোটি বাঙালি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া, তাদের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা—যেকোনো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্যই ছিল এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ।

তাত্ত্বিক বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ দূরে সরিয়ে রেখে ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল শরণার্থী শিবির গড়ে তুলেছিলেন। তৎকালীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিশ্ববাসীর সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মানবতা ও বন্ধুত্বের এমন নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

​১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি করে নিয়ে যায় এবং সেখানে প্রহসনের বিচারে তাঁর ফাঁসির ষড়যন্ত্র চলে। বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষায় ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর তীব্র কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে বার্তা পাঠান যে, বঙ্গবন্ধুর সামান্য ক্ষতি হলে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তাঁর এই সময়োপযোগী ও কূটনৈতিক চাপের কারণেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গোপনে প্রহসনের রায় কার্যকর করার সাহস পায়নি।

তিনি জানতেন, মুক্তিসংগ্রামের এই ক্রান্তিলগ্নে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি ও নিরাপত্তা কতটা অপরিহার্য।
​বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে চূড়ান্ত পরিণতি দিতে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর সামরিক চাপ বাড়াতে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ইন্দিরা গান্ধী সরকার স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’কে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করে।

ভুটানের ঠিক পরেই দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। একই দিনে ভারত সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ঐতিহাসিক মিত্রতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা আমাদের বিজয়ের পথকে আরও সুগম করেছিল। পরবর্তীতে ৩ ডিসেম্বর ভারত সরাসরি মিত্রবাহিনী হিসেবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং মাত্র ১৩ দিনের মাথায় যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

​দেশ ও জাতির কল্যাণে যিনি আজীবন লড়াই করে গেছেন, সেই লৌহমানবী ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নিজ বাসভবনে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিজস্ব নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত তাঁরই দুই দেহরক্ষী অতর্কিত গুলিবর্ষণে তিনি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাঁর সেই আকস্মিক ও নৃশংস প্রয়াণে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল গোটা বিশ্ব।

​আজ ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়াণ দিবসে আমাদের জাতীয় স্মৃতির মণিকোঠায় ভেসে ওঠে সেই দৃঢ়চেতা নারীর প্রতিচ্ছবি, যিনি ঝড়-ঝাপ্টার মাঝেও ছিলেন হিমালয়ের মতো অবিচল। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বন্ধুত্বের বীজতলাটি রোপণ করেছিলেন তিনি। ইতিহাসের এই মহান বন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের সোপানে তাঁর অবদান চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

( মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)

এই শাখার আরও খবর

সুনামগঞ্জে যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষীর বাড়ি-দোকানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায়। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাতে উপজেলার প্রত্যন্ত…

হুমকির অভিযোগে এলাকা ছাড়লেন মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর বোন

প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কথা বলার পর হুমকির মুখে এলাকা ছেড়েছেন তার বোন হেনা বেগম। আতঙ্কে…

নেভিগেশনব্যবস্থা উন্নত করতে মহাকাশে ভারতের নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ

ভারতের নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থা ‘ন্যাভিক’ আরও শক্তিশালী করতে মহাকাশে নতুন স্যাটেলাইট ‘এনভিএস-০৩’ উৎক্ষেপণ করেছে দেশটির মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) রাতে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটা…

এইচএসসির ফল প্রকাশ, পাসের হার মাত্র ৫২%, বিপর্যয়ে হতাশায় শিক্ষার্থীরা

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার মাত্র ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।…

ডিবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীর কোটি টাকার স্বর্ণ লুট

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিচয় দিয়ে যাত্রীবাহী বাস থেকে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে নামিয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার স্বর্ণ ও রুপার অলংকার লুটের…

হংকংয়ে সমুদ্রের তলা দিয়ে ট্রেনযাত্রার অনন্য অভিজ্ঞতা

সমুদ্রের গভীরে সাবমেরিনে চড়ে ভ্রমণের অনুভূতি পেতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন হংকংয়ের ওশান পার্কে। সেখানে রয়েছে ‘ওশান এক্সপ্রেস’ নামে বিশেষ এক ট্রেন, যা যাত্রীদের নিয়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au