মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলায় এক বিশিষ্ট হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাকে অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, দিনাজপুর জেলার বাসুদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী ভবেশ চন্দ্র রায়ের মৃতদেহ বৃহস্পতিবার রাতে উদ্ধার করা হয়।
ভবেশ চন্দ্র রায়ের স্ত্রী শান্তনা রায় দ্য ডেইলি স্টার-কে জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে একটি ফোন কল পান তাঁর স্বামী। সেই কলটি অপরাধীরা করেছে বলেই সন্দেহ করা হচ্ছে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় তিনি বাড়িতে আছেন কিনা। প্রায় ৩০ মিনিট পর দুইটি মোটরসাইকেলে চারজন ব্যক্তি এসে ভবেশ রায়কে তাঁর বাড়ি থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়।
পরে তাঁকে নরাবাড়ি গ্রামে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। মারধরের ফলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং এরপর তাঁকে তাঁর বাড়িতে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে দিনাজপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান, তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এদিকে আজ বাংলাদেশ পুলিশের Facebook page থেকে জানানো হয় যে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ০৭.০০ ঘটিকায় নাড়াবাড়ি বাজারে দুধ-হাটিতে রতন, আতিক, রুবেল, মুন্না ও ভবেশ চন্দ্র একসাথে অহিদুলের চায়ের দোকানে চা পান করেন। চা পান কালে তারা স্বাভাবিক ছিলেন এবং তাদের মধ্যে কাউকে শারীরিকভাবে অসুস্থ মনে হয়নি। চা পান শেষে ভবেশ পাশের দোকান থেকে পান ও সিগারেট খায়। কিছুক্ষণ পরে ভবেশ চন্দ্র হাটখোলার একটি ঘরের খুঁটিতে হেলান দেন। পরে মাথা ঘুরে সেখানে বসে পড়েন এবং প্রচন্ড ঘামতে থাকেন। পান দোকানদার মতিবুর রহমান (৫২) এর সাথে কথা বললে তিনি জানান ভবেশ খয়ের, চুন ও কাঁচা সুপারি দিয়ে তার কাছ থেকে পান নিয়েছে। পান খাওয়ার একপর্যায়ে ভবেশ পানের দোকানের সামনে হাটখোলার একটি ঘরের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে পড়েন। এসময় তার সাথে থাকা কয়েকজনসহ স্থানীয়রা ধরাধরি করে পাশেই পল্লী চিকিৎসক লিটনের দোকানে নিয়ে যায়। স্থানীয়রা জানান পল্লী চিকিৎসক প্রথমে তার প্রেসার মেপে দেখেন প্রেসার শুন্য হয়ে গেছে।
ভ্যানচালক সাদ্দাম হোসেন জানান, এশার নামাজের সময় পল্লী-চিকিৎসক লিটনের দোকান হতে রতন ও আতিকরা ভবেশকে তার ভ্যানগাড়িতে তুলে নাড়াবাড়ি বাজারের শেষ মাথায় পল্লী-চিকিৎসক আব্দুর রহমানের চেম্বারে নিয়ে গেলে পল্লী-চিকিৎসক আব্দুর রহমান এর ছেলে পল্লী-চিকিৎসক সোহেল রানা (৩২) ভবেশের প্রেসার মেপে প্রেসার মাপার যন্ত্রে কোন রিডিং না পাওয়ায় তিনি তাকে দ্রুত দিনাজপুর মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
রাত ২০.৩০ ঘটিকার দিকে ভবেশের ছেলে স্বপন শহর থেকে একটি এম্বুলেন্স নিয়ে ফুলবাড়ী হাটে আসেন। ততক্ষণে ভবেশের স্ত্রী ও শ্যালক সেখানে উপস্থিত হন। তারা অ্যাম্বুলেন্সে করে রাত ২১.১৮ মিনিটে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ইসিজি পরীক্ষা করে ভবেশকে মৃত ঘোষণা করলে তার আত্মীয়-স্বজন ভবেশের মৃতদেহ নিয়ে নিজ বাড়িতে আসেন। রাত অনুমান ২৩.৪৫ ঘটিকায় ভবেশের পরিবার থেকে বিরল থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। রাত ০০.৩০ ঘটিকায় পুলিশ বাসুদেবপুরে ভবেশের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে ভবেশের সুরতহাল কার্য সম্পন্ন করেন। নিহত ভবেশের শরীরের কোথাও কোন মারপিট কিংবা আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তদুপরি পরিবারের সন্দেহের প্রেক্ষিতে বিরল থানা পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ভবেশের মরদেহ পোস্ট মর্টেমের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে ভবেশের পরিবার মর্গ থেকে মৃতদেহ গ্রহণ করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন। পোস্ট মর্টেম প্রতিবেদন অচিরেই পাওয়া যাবে।
ভবেশ চন্দ্র রায় দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন এলাকার একজন প্রভাবশালী হিন্দু নেতা এবং সম্প্রদায়ের নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।
বিরল থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুস সাবুর দ্য ডেইলি স্টার-কে জানান, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পুলিশ কাজ করছে এবং একটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। এই ঘটনায় নিহতের পরিবারকে অভিযোগ দায়ের করতে বলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
দিনাজপুরের পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইন ভারতীয় মিডিয়ার সংবাদ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা বিব্রতকর। ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। যদি কোনও ঘটনা ঘটে থাকে, ঘটনা যদি প্রকৃত না ঘটে থাকে সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে কোনও কিছু মিডিয়াতে বলা ঠিক না।’
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বাংলাদেশের হিন্দু নেতা ভবেশ চন্দ্র রায়কে অপহরণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। শনিবার (১৯ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘু নেতা ভবেশ চন্দ্র রায়ের অপহরণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই ঘটনা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চলমান ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত নিপীড়নেরই একটি প্রতিফলন। আগের অনেক ঘটনার মতো এবারও অপরাধীরা অব্যাহতভাবে শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে ভারতের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে এবং বলেছে, “এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়নের অংশ হিসেবেই একে দেখতে হবে।” দলটি বাংলাদেশ সরকারকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ড হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং এ নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।