যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন; ছবি সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৯ জুলাই-
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর খুশি নন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ভাবছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে নিজের মন্ত্রিসভার সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘পুতিন আমাদের উদ্দেশ্য করে অনেক আজেবাজে কথা বলেছেন।’ট্রাম্প আরও বলেন, পুতিন অনেক মানুষকে হত্যা করছেন। এর মধ্যে অনেকেই তাঁর নিজের সেনা, আবার অনেকে ইউক্রেনের সেনা।
রাশিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে সিনেটের প্রস্তাবিত একটি বিলের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’তবে ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, সেই বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি ট্রাম্প।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাদের বলব না। আমরা কি একটু চমক রাখতে পারি না?’ এরপর তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলার প্রসঙ্গের দিকে কথা ঘুরিয়ে নেন। বলেন, দীর্ঘ পরিকল্পনার পর ওই হামলা চালানো হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘ইউরোপ কখনোই ইউক্রেনকে ছেড়ে যাবে না।’মাখোঁ বলেন, যেসব দেশ নিজেদের ইচ্ছায় ইউক্রেনকে সাহায্য করতে চায়, তাদের নিয়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স মিলে একটি জোট গড়ে তুলবে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ আরও বলেন, ‘আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করব, যেন যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা যায়, যেন শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা শুরু করা যায়। কারণ, ইউক্রেনে শুধু তাদের নিরাপত্তাই নয়, আমাদের নিরাপত্তা ও মূল মূল্যবোধও এখন ঝুঁকিতে পড়েছে।’
এর আগে গতকাল ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রশাসন ইউক্রেনে আরও অস্ত্র পাঠাবে। নতুন চালানটিতে মূলত ‘আত্মরক্ষামূলক’ অস্ত্র থাকবে।যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজেদের অস্ত্রের মজুত কমে আসার কারণে ওয়াশিংটন কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছিল। পেন্টাগন বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সক্ষমতা ‘পর্যালোচনা’ করছে।
নির্বাচনী প্রচার চলাকালে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে ইউক্রেনে দ্রুত যুদ্ধ থামাবেন। ইতিমধ্যে কয়েকবার টেলিফোনে পুতিনের সঙ্গে কথা বলাসহ বেশ কিছু কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত তিনি সহিংসতা থামাতে সক্ষম হননি।
গত মে মাসে ইউক্রেন ও রাশিয়ার কর্মকর্তারা তুরস্কে সরাসরি আলোচনায় অংশ নেন এবং বন্দিবিনিময়ের বিষয়ে সম্মত হন। তবে স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো তো পরের কথা, দুই পক্ষ এখনো সাময়িক যুদ্ধবিরতিতেই সম্মত হতে পারেনি।
গতকাল ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউক্রেনের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য সম্ভাব্য তারিখ জানতে মস্কো অপেক্ষা করছে। আলোচনার তারিখ চূড়ান্ত হলে তা ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন পেসকভ।
গত কয়েক সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনের শহরগুলোতে দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। কয়েক মাস ধরে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন অংশের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে।
গত সোমবার তারা ইউক্রেনের দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের ডাচনে নামক গ্রাম দখলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের সম্পর্ক আধুনিক বিশ্বরাজনীতির অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত অধ্যায়। ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় থেকেই ট্রাম্প পুতিনের প্রতি একধরনের প্রকাশ্য প্রশংসা ও সহানুভূতি দেখিয়ে আসছিলেন। তিনি একাধিকবার পুতিনকে শক্তিশালী নেতা বলে আখ্যা দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখাকে ইতিবাচক বলে মনে করেন।
তাদের এই সম্পর্কের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল রাশিয়ার নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একমত হয় যে, রাশিয়া ট্রাম্পকে সহায়তা করতে ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ট্রাম্প এই অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেন এবং পুতিনকেও প্রকাশ্যে নির্দোষ বলে উল্লেখ করেন। ২০১৮ সালে হেলসিঙ্কিতে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প এমনকি নিজের দেশের গোয়েন্দা সংস্থার বক্তব্যের চেয়ে পুতিনের কথা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে পুতিনের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখেন। ট্রাম্প একদিকে ন্যাটোর মিত্রদের সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে পুতিনকে ‘চতুর’ বা ‘স্মার্ট’ বলে প্রশংসা করেছেন, যা অনেকের মতে রাশিয়ার কৌশলগত সুবিধাকে সহায়তা করেছে।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পরও ট্রাম্প বলেন, তার সময় এই যুদ্ধ ঘটত না, আর পুতিনকে কৌশলী হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও তিনি যুদ্ধের সমালোচনাও করেন, তবে তার এই মন্তব্যগুলো তাকে পুতিনের প্রতি নরম মনোভাবের সমালোচনায় ফেলেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ট্রাম্প ও পুতিনের সম্পর্ক মূলত ব্যক্তিগত রসায়ন, পারস্পরিক রাজনৈতিক লাভ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে গড়ে উঠেছিল। এই সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক নীতির চেয়ে ভিন্ন ধারার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা সমালোচক ও সমর্থক—উভয়পক্ষের মধ্যেই দীর্ঘদিন বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে।
সুত্রঃ আল জাজিরা