ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালকদের শান্তি সমাবেশ। ছবি : এএফপি
মেলবোর্ন, ৬ সেপ্টেম্বর- ইন্দোনেশিয়ায় একজন ডেলিভারি রাইডারের মৃত্যুর পর শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া এ বিক্ষোভ এখন আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা কুড়িয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও সাধারণ মানুষ ইন্দোনেশিয়ার আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। খাবার পাঠিয়ে, সহমর্মিতা জানিয়ে তাঁরা বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন।
গত সপ্তাহে জাকার্তায় বিক্ষোভ চলাকালে জনপ্রিয় ডেলিভারি অ্যাপ গোজেকের চালক আফফান কুরনিয়াওয়ান পুলিশের গাড়িচাপায় নিহত হন। এ ঘটনার পর জনরোষ চরমে পৌঁছে যায়। এরপর থেকেই পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ নতুন করে বিস্ফোরিত হয়েছে এ ঘটনায়। এখন পর্যন্ত এসব বিক্ষোভে অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এ ঘটনার প্রভাব শুধু ইন্দোনেশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রতিবেশী মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের অনেকে অনলাইন ডেলিভারি অ্যাপ—যেমন গ্র্যাব ও গোজেক—ব্যবহার করে ইন্দোনেশিয়ার ডেলিভারি রাইডারদের খাবার পাঠাচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া হ্যাশট্যাগ #সিবলিংগস (#SEAblings) এ উদ্যোগকে আরও গতি দিয়েছে। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করে তৈরি এই শব্দটি এখন সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ফিলিপাইনের সেবু দ্বীপের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী তারা নামের এক নারী জাকার্তায় ডেলিভারি রাইডারদের জন্য একাধিকবার খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস অর্ডার করেছেন। প্রথমবার তিনি ভরপুর খাবার পাঠান দুজনের জন্য, আরেকবার মিনারেল ওয়াটারের একটি কার্টন।
তারা বলেন, ‘আমি সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ঘুরেছি। প্রতিবারই মোটরসাইকেল ট্যাক্সি ব্যবহার করেছি। চালকেরা সবসময়ই বন্ধুসুলভ ছিলেন। আমি মনে করেছি, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। খাবার পাঠানোই তাঁদের সাহায্য করার সবচেয়ে সহজ উপায়।’
এমনকি তিনি খাবার পাঠানোর প্রক্রিয়াটি টাগালগ ভাষায় অনুবাদ করে অনলাইনে পোস্ট করেছেন, যাতে ফিলিপাইনের অন্য মানুষও সহজে ইন্দোনেশীয়দের সাহায্য করতে পারেন।
একইভাবে মালয়েশিয়ার তরুণ শিক্ষার্থী আয়মান হারিজ মুহাম্মদ আদিব জানিয়েছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইন্দোনেশীয়দের সাহসী প্রতিবাদ দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে খাবার পাঠিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এটা প্রমাণ করে জনগণের হাতে শক্তি আছে। যখন অন্যায় তাদের ক্ষতি করে, তখন তারা এক হয়ে লড়াই করে।’
ইন্দোনেশিয়ার ডেলিভারি রাইডাররা এ সহায়তা পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়েছেন। পশ্চিম জাকার্তায় কাজ করা তৌফিক নামের এক রাইডার সিঙ্গাপুরের একজন ব্যবহারকারীর কাছ থেকে এক বাটি ভাত ও পানীয়ের অর্ডার পান। তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর অর্ডার অনেক কমে গেছে। তাই বিদেশ থেকে আসা এমন খাবার আমাদের জন্য সত্যিই অনেক উপকারী।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, এক রাইডার কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিঙ্গাপুরের একজন দাতাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘অসংখ্য রাস্তা, রেস্তোরাঁ, স্কুল ও অফিস বন্ধ। ফলে আমাদের আয় কমে গেছে। কিন্তু বিদেশের মানুষ এখনো আমাদের খেয়াল রাখছেন, এটা আমাদের জন্য ভীষণ আবেগের।’
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন শহরে সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সরকার বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন, তাঁদের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে।
এই আন্দোলন এখন কেবল ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা প্রমাণ করছে, সীমান্ত পেরিয়ে মানবিক সংহতি গড়ে তোলা সম্ভব। খাবারের প্যাকেট হয়ে উঠছে প্রতিবাদের ভাষা, সমর্থনের প্রতীক এবং এক অভূতপূর্ব আঞ্চলিক ঐক্যের বার্তা।
সূত্রঃ বিবিসি